কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার আট বছর পূর্ণ হলো আজ। তবে এখনও ন্যায় বিচার পায়নি নিহতের পরিবার।
ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সকালে নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নে অবস্থিত নিজ বাড়ি কলোনীটারীতে মিলাদ মাহফিল ও কাঙালি ভোজের আয়োজন করে তার পরিবার। এছাড়াও রোববার রাতে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার-উল-আলম নুর ইসলাম ফেলানীর পরিবারের খোঁজখবর নেন। বিজিবির পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিল পরিচালনা ও নতুন কাপড়ের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবা নুর ইসলামের সঙ্গে মই দিয়ে কাঁটাতার টপকে বাংলাদেশে ফেরার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী। ফেলানীর নিথর দেহ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল চার ঘণ্টা। এ হত্যাকাণ্ডে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমসহ মানবাধিকার কর্মীদের মাঝে সমালোচনার ঝড় উঠলে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হয়।
২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয় ভারতের কোচবিহারের সোনারী ছাউনিতে স্থাপিত বিএসএফের বিশেষ আদালত। পুনরায় বিচারের দাবিতে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে আবেদন করেন। পরে বিজিবি-বিএসএফের দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে ফেলানী হত্যার বিচার পুনরায় করা সিদ্ধান্ত হয়।
২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু করে বিএসএফ। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বিএসএফের বিশেষ আদালতে অমিয় ঘোষকে অভিযুক্ত করে পুনরায় সাক্ষ্য দেন এবং অমিয় ঘোষের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
পরে ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর বিচারিক কাজ চলার সময় বিএসএফ আদালতে অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ অসুস্থ হয়ে পড়ায় চার মাসের জন্য বিশেষ আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়েছে।
এরপর ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানী খাতুন হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে দেশের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর শুনানির পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে বারবার তারিখ পিছিয়ে যায়। ফলে থমকে গেছে ফেলানী খাতুন হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি।
ফেলানীর প্রতিবেশী পল্লী চিকিৎসক আব্দুল মান্নান ও কৃষক আজমত আলী জানান, সারা বিশ্ব এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জেনেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে ফিরে গেছে। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। আমরা বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে হতাশ। এই নির্মম হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
অপরদিকে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম বলেন, সরকার আমাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেভাবে পাশে দাঁড়ায়নি। এছাড়াও বারবার শুনানি পিছিয়ে যাওয়া ও বিচার কাজ আটকে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন জানান, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ ফেলানী হত্যা ও ক্ষতিপূরণের শুনানি রিট আবেদন গ্রহণ করে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত আগামী ১৮ জানুয়ারি দুটি রিটের শুনানির দিন ধার্য করে। শুনানি পিছিয়ে গেলেও ফেলানীর পরিবার ন্যায় বিচার পাবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জানান, ফেলানীর পরিবারকে বিভিন্ন সহযোগিতা ছাড়াও জেলা প্রশাসন ও বিজিবির উদ্যোগে একটি দোকান করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তারা যখনই এসেছে তাদেরকে সহায়তা করা হয়েছে।
নাজমুল হোসাইন/আরএআর/এমএস/এসজি