মতামত

সাম্প্রতিক অগ্নি দুর্ঘটনা আর আমার উপলব্ধি

 

যাওয়ার সময় ব্যাপারটা ততটা ভয়াবহ বলে মনে হয়নি। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের এপ্রোচটা মেরামতের জন্য বন্ধ। আমাদের গন্তব্য কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা শিবির। লিভার ডিজিজ সংক্রান্ত গবেষণার কাজে আসা বলে কুতুপালংয়ে যাওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক।

বিচের উপর দিয়ে মেরিন ড্রাইভের যে টেম্পোরারি এপ্রোচটা, তা দিয়ে আমাদের ভাড়া করা মাইক্রোবাসের ড্রাইভার সাহেব পার হয়ে গেলেন অনায়াসেই। ভোর বেলা, সাগরে ভাটার টান- ব্যাপারটা যে জোয়ারের সময় কি হতে যাচ্ছে বুঝিনি তখনও। ক্যাম্পে কাজ শেষে যখন কক্সবাজারে ফিরছি বঙ্গোপসাগরে তখন জোয়ারের নাচন। কপালটা এমন খারাপ, বিচ ধরে মাঝামাঝি আসতেই মাক্রোবাসের চাকাটা নরম বালিতে দেবে গেল।

জোয়ারের পানিতে গাড়িটা প্রায় ডুবু ডুবু। ‘কি করবো? গাড়িটার কি হবে?’ এমনি সব দুশ্চিন্তায় যখন মাথার চুল ছেঁড়ার জোগাড়, তখনই কোত্থেকে এসে হাজির হলো জনা বিশেক অপরিচিত লোক। জোগাড় হয়ে গেল বড় বড় কাঠের পাটাতন। প্রায় কাঁধে করেই গাড়িটাকে উদ্ধার করলো অপরিচিত মানুষগুলো।

মনে পড়লো কদিন আগের দুবাইয়ের স্মৃতি। ডিউন ব্যাশিং আর মরুভূমিতে ডিনার শেষে দুবাই ফিরছি। এর মধ্যে আমাদের ভাড়া করা ল্যান্ড ক্রুজার ভি৮’র এর চাকা দেবে গেল আরব মরুর বালিতে। আমাদের ড্রাইভার বেচারার বাড়ি চট্টগ্রামে। দীর্ঘদিন দুবাইয়ে থাকায় চোস্ত আরবিতে কথা বলেন। বোঝার কোন উপায় নেই যে এই চাটগাইয়া নওজোয়ান আরবি নন। তাতে অবশ্য কাজ খুব একটা হলোনা। বেচারা হাজার চেষ্টায়ও সাহায্যের জন্য একটি লোককেও খুঁজে পেলোনা কোথাও।

এদিকে যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আমাদের টেনশনের ব্যারোমিটারের পারদ, তখন হঠাৎই পর পর দাঁড়িয়ে পড়লো পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকটা টুরিস্ট ভেহিকেল। নেমে পড়লেন কয়েকজন অপরিচিত চালক। সবার চেষ্টায় বিপদ থেকে উদ্ধার পেলাম সে রাতে। মজার ব্যাপার এরা প্রত্যেকেই প্রবাসী বাঙালি গাড়িচালক।

সম্প্রতি ঢাকায় পর পর কয়েকটি বড় অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে প্রাণহানিও। যখনই কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তা আমাদের নাড়া দিয়ে যায়। আর এসব দুর্ঘটনার সাথে অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে থাকে ঘটনা পরবর্তী আলোচনা-পর্যালোচনা। কি হলো, কেন হলো, কি হলে কি হতো না আর কি হলে আরো ভালো হতো ইত্যাদি ইত্যাদি আলোচনায় আমরা সবাই জড়িয়ে পড়ি, যতক্ষণ না পরবর্তী দুর্ঘটনাটি আমাদের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়। একজন চিকিৎসক হিসেবে দুর্ঘটনা পরবর্তী এমনিতরো সব পর্যালোচনায় অংশ নিতে হয় আমাদেরও, তা সে আমরা দুর্ঘটনার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকি, চাই না-ই থাকি। থাকে পেশাগত আগ্রহ, সাথে থাকেন কৌতূহলি অন্যান্যরা।

সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো খুবই সফলভাবে সামাল দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যারা সরাসরি জড়িত তারাতো বটেই, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ আর আশেপাশের সাধারণ মানুষের নিঃশর্ত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত সহযোগিতা- এই প্রতিটি দুর্ঘটনার পর-ই জাতি হিসেবে বাঙালিকে আরো একবার করে গৌরবান্বিত করেছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে দুর্ঘটনাটা না ঘটলেই ভালো ছিল, কিন্তু ঘটে যখন গেছেই, তখন এও স্বীকার করতে হবে যে বাঙালি ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই সম্ভবত এত কম সময়ে আর এত কম লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে এমন দুর্ঘটনা সামাল দেয়া সম্ভব ছিল না।

কক্সবাজার থেকে দুবাই হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর পুরোনো ঢাকার চুড়িহাট্টায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক অগ্নি দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আনার উদ্দেশ্যও এটাই। এসব ঘটনা প্রমাণ করে এটাই বাঙালিয়ানা, এটাই বাঙালির বাঙালিত্ব।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুর্ঘটনাটি যেহেতু আমার পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এর যে ঘটনাক্রম তা দেখার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে খুব কাছ থেকে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মাচারী আর মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা অংশ নিয়েছেন অগ্নি নির্বাপণে আর উদ্ধার অভিযানে।

মাত্র আধঘন্টারও কম সময়ের ভিতর হাসপাতালের সামনে মাঠে স্থাপন করা হয়েছে ফিল্ড হাসপাতাল। হিউম্যান চেইন তৈরি করে বহুতল এই হাসপাতালটির রোগীদেরকে সরিয়ে আনা হয়েছে এই ফিল্ড হাসপাতালে আর অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগের প্রকারভেদ অনুযায়ী তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে।

আগুনের সূত্রপাত যেখানে তার কাছেই শিশু ওয়ার্ড। অপারেশন শেষে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছিলেন বিশ জনেরও বেশি রোগী। কারো হয়নি কিছুই। কোন রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই নিরাপদে সরিয়ে আনা গেছে ভেন্টিলেটারে থাকা আইসিইউ’র দশ জন রোগীকেও। চিকিৎসকরা, নার্সরা, ছাত্ররা আর কর্মচারীরা ধোয়ায় ভরা স্টোর থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার বের করে নিয়ে এসে, নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন অসুস্থ মানুষগুলোর।

একদিকে যখন জ্বলছে আগুন তখন অন্যদিকে ওটিতে মোবাইল ফোনের আলোতে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন শেষ করেছেন চিকিৎসক, এমন ঘটনাও সেদিন ঘটেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অবাক হয়ে দেখেছি কি অদ্ভুত দ্রুততায় এগিয়ে এসেছেন আশেপাশের সাধারণ মানুষ, পাশের শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও ফায়ার বিগ্রেড।

কারো কৃতিত্বকে ছোট আর কাউকে বড় করে দেখার কোন সুযোগ নেই। সেদিন জীবন বাজি রেখে এগিয়ে এসেছিলেন প্রত্যেকেই। যে ছাত্রলীগকে কথায় কথায় গালি দেয়া আমাদের আজকের ফ্যাশন, সেই ছাত্রলীগের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ইউনিটের সদস্যরাও স্থাপন করেছেন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। পুরো উদ্ধার যজ্ঞে তাদের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতই।

অসহায় বাঙালির সাহায্যে সেদিন পিছিয়ে থাকেনি সরকারি দায়িত্বে থাকা কিংবা নিছক কৌতূহলবশে এগিয়ে আসা কোন বাঙালিই। প্রত্যেকে এই কাজটিকে তার নিজের কাজ আর হাসপাতালটিকে তার নিজের হাসপাতাল মনে করে এগিয়ে এসেছিলেন। আগুনে যখন পুড়ছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মনে হচ্ছিল রাতের কালো আকাশে তখন তার চেয়েও ঢের বেশি উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছিল বাঙালির বাঙালিয়ানা।

এর মাঝেও একজন পাগলাটে হাসপাতাল পরিচালকের কথা দু’এক কলম না লিখলেই নয়। তাকে আমি চিনি ছাত্র জীবন থেকে। তার জমানায় তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ আর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের ডাকসাইটে নেতা। পেশা জীবনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নীত করায় ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত অনুচর।

জোট সরকারের সময়ে দেশের আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের মতই এই মেডিকেল কলেজটির নামটিও বদলে দেয়া হয়েছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ছুঁড়ে ফেলে ঝুলানো হয়েছিল একজন বেগমের নামের সাইনবোর্ড। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেই কলঙ্ক মোচনেও ছিল তার অগ্রণী ভূমিকা।

গত ক’বছর হাসপাতালটিতে অগ্নি দুর্ঘটনা আর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ এই পরিচালক মহোদয়ের। এমনকি মাননীয় মন্ত্রীবর্গের উপস্থিতিতে, ফায়ার বিগ্রেডের অংশগ্রহণে ফায়ার ড্রিলও করিয়েছেন কদিন আগে। পিঠপিছু হেসেছি আরো অনেকের মতই আমিও। ভেবেছি এ আবার কি ভিমরতিতে পেল তাকে?

দুর্ঘটনার দিন টিভির স্ক্রলে যখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ব্রেকিং নিউজটা প্রথম দেখলাম তখন শ্রদ্ধায় অবনত হয়েছি হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার প্রতি। আগে হাসলেও সেদিন বুঝেছি দূরদৃষ্টির মূল্য কতখানি। তাই শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যখন অগ্নিকাণ্ডের ঘন্টা খানেক পরেই আবারো ফিরে আসলো কর্মচাঞ্চল্য তখন অবাক হইনি এতটুকুও।

আর ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে নিজ চোখে যখন দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুদুর জার্মানিতে বসে কিভাবে নিজে মনিটর করছেন দুর্ঘটনা পরবর্তী প্রতিটি কার্যক্রম, তখন বুঝেছি কতটা নিরাপদ আমি। এটাই শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, এখানেই আছে বাঙালির বাঙালিয়ানার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ আর প্রকাশ। আর এখানেই পরম নিরাপদ আমি আমার পরবর্তী প্রজন্ম।

লেখক : অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/এমএস