ফেনীর ২৫০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই। হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। এতে শব্দ দূষণ, রোগী ও স্বজনদের বিড়ম্বনা বেড়েছে। রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সোমবার সকালে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ডের প্রধান ফটকে সাঁটানো হয়েছে একটি বোর্ড। বোর্ডে দেয়া তথ্যমতে এখানে ২৬ জন রোগীর শয্যার রয়েছে। কিন্তুু বর্তমানে এখানে ৭৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর নির্ধারিত শয্যার ডানে, বাঁয়ে, মাথার পাশে, পায়ের পাশে অতিরিক্ত বেড বিছিয়ে রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। একটি শয্যার চারপাশে মেঝেতে অতিরিক্ত বেড বিছিয়ে সেবা নিচ্ছেন রোগীরা।
আবার ভেতরে জায়গা না পেয়ে পাশের বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেক রোগী। ওয়ার্ডের প্রবেশ পথে রোগীরা মেঝেতে শয্যা বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে করে একদিকে বেড়েছে শব্দ দূষণ অন্যদিকে বেড়েছে বিড়ম্বনা। রোগীরা পাচ্ছেন না চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ।
হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার নুর নবী বলেন, এটি শুধু আজকের পরিস্থিতি নয়। ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে রোগীর এমন চাপ প্রায় সময়ই আমাদের মেনে নিতে হয়। রোগীর স্বজনরা অনেক সময় সিটের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিরক্ত করেন। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রধান ফটকে আমরা হাসপাতালে রোগীর সিট ক্যাপাসিটি ও বর্তমান রোগীর সংখ্যা প্রদর্শন করে থাকি। এতে করে রোগীর স্বজনরা সচেতন হয়।
একইভাবে শিশু ওয়ার্ডে ২৬ জন রোগীর শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তুু বর্তমানে ওই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে ৮৬ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ২৬ জনের শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে ৭৫ জন, মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ২৬ জনের স্থলে চিকিৎসা নিচ্ছে ৭২ জন, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১৭ জনের স্থলে ৫৫ জন, ডেলিভারি ওয়ার্ডে ১৭ জনের স্থলে ২৪ জন, পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ৩২ জনের শয্যা স্থলে ৪৮ জন ও মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ১৬ জনের স্থলে ৪০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
মেডিসিন ওয়ার্ডে গত নয়দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন মো. আসাদুজজামান। তিনি বলেন, এখানে অতিরিক্ত রোগীর চাপে এক ধরনের কোলাহল লেগেই থাকে। পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক পাখা থাকার পরও রোগী ও স্বজনদের চাপে সবসময় ভ্যাপসা গরম লাগে। কর্মরত নার্সদের সেবার জন্য ডাকলে পাওয়া যায় না। হাসপাতাল থেকে তেমন কোনো ওষুধ দেয়া হয় না। তবে খাবার ও নাস্তা ঠিক সময়ে পেলেও আমার শয্যার নিচে থাকা রোগীদের খাবার ও নাস্তা কিনে খেতে হয়।
হাসপাতালে দায়িত্বরত সিনিয়র নার্স হাসিনা বেগম বলেন, রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সময় হাতের কাজ সেরে অন্য রোগীর কাছে যেতে একটু সময় লাগে। এতে করে রোগীর স্বজনরা মাঝেমধ্যে ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু আমাদের কি করার আছে। ২৬ জনের শয্যায় ১০০ জনের চিকিৎসা দিলে তো বিড়ম্বনা মেনে নিতেই হবে। তবে হাসপাতালের সব নার্স রোগীদের সেবাদানে আন্তরিক।
শিশু ওয়ার্ডের কনসালট্যান্ট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাইরাসজনিত ফুসফুসে প্রদাহের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে অনেক শিশু ভর্তি হয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর কারণে চিকিৎসা দিতে আমাদের কষ্ট হয়। শয্যার অতিরিক্ত রোগী হওয়ায় ৫-৭ বছর আগের পরিত্যক্ত বিছানা মেঝেতে বিছিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) আবু তাহের পাটোয়ারী বলেন, হাসপাতালের ৭টি ওয়ার্ডে ২৫০ শয্যায় রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তুু এখানে মেডিসিন, শিশু, ডায়রিয়া, সার্জারি ও গাইনি বিভাগে সবসময় রোগীর চাপ বেশি থাকে। তারপরও চিকিৎসক ও নার্সরা সার্বক্ষণিক সর্বোচ্চ সেবা দিতে তৎপর রয়েছেন। তবে অতিরিক্ত রোগীর চাপে কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যায় না।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক দেলোয়ার হোসেন বলেন, অতিরিক্ত রোগীর কারণে আমরা বিছানা দিতে পারছি না। অনেক সময় অপারেশনের রোগীকেও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে পারছি না। শয্যার বাইরে মেঝেতে থাকা রোগীদের খাবার ও নাস্তা দেয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালে জনবল সঙ্কট, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাব তো আছেই। এত কিছুর পরও চিকিৎসকসহ সবাই সেবার মানসিকতা নিয়ে হাসপাতালে কাজ করে যাচ্ছেন।
রাশেদুল হাসান/এএম/এমএস