কৃষি ও প্রকৃতি

ইলিশশূন্য মেঘনা, জেলেদের হাহাকার

বিশাল মোহনা নিয়ে জেগে আছে মেঘনা। সেই বঙ্গোপসাগরের সীমানা ছুঁয়ে দেশের মেরুদণ্ড ছুঁয়ে বহমান নদী। দেশের খরস্রোতা নদীগুলোর মধ্যে সবার ওপরে মেঘনার অবস্থান বলা চলে। কিন্তু এমন খ্যাতি থাকার পরেও সুসংবাদের প্রত্যাশা যে পাঠক পাবে, সেটা এখন কেবলই স্বপ্ন। কারণ গত কয়েক মাসের ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় পার হতে চললেও মেঘনা নদী থেকে তেমন ইলিশের দেখা মিলছে না। এতে চরম হতাশা আর দুশ্চিন্তা বয়ে বেড়াচ্ছেন মেঘনার জেলেরা।

মেঘনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুর ও ভোলার জেলে সম্প্রদায়ের চেহারায় কষ্টগুলো খুব স্পষ্ট। নদীতে ইলিশের তেমন দেখা না মেলায় অনেকেই লোকসান গোনার ভয়ে কূলেই বেকার দিন পার করছেন। ধার-দেনা করে কোন মতে সংসার চললেও ভবিষ্যৎ কেবলই অন্ধকার দেখছেন এসব জেলে। ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় যেমন ধার-দেনা করে জেলেরা চলেছেন, সে অবস্থা বদলায়নি এখনো।

> আরও পড়ুন- ভাগনা মাছের পোনা উৎপাদনে বাকৃবি গবেষকদের সফলতা

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মেঘনাতীরের মতিরহাট। বাজারের দক্ষিণে নদীপাড়ে বেশ কয়েকটি নৌকা দেখে সামনে এগিয়ে গেলাম। বড় একটি নৌকা। চার জেলে জাল বুনছেন আর বাকি দু’জন অন্য কাজে ব্যস্ত। কাছে গিয়ে জানা যায়, তাদের বাড়ি দ্বীপ জেলা ভোলার পশ্চিম ইলিশায়। ওখানে ইলিশের দেখা না পেয়ে তারা এসেছেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনায়। কিন্তু এখানেও ইলিশের দেখা না মেলায় যেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। জেলে আবদুর রহমান সাবরাশি বলেন, ‘কোন মাছ নেই নদীতে। আমরা আজ নদীতে যাইনি। মাছ না পেলে আমাদের কোন উপায় থাকে না। অনেক কষ্ট করে চলতে হয়। আমাদের অন্য কোন পেশা নেই।’

সামনে বেশি না এগোতেই দেখা মেলে বেশ কিছু মানতা সম্প্রদায়ের নৌকার। নৌকাগুলো দুলছে আর ভাসছে নদীর জোয়ারে। চোখ ফেরালেই দেখা মেলে নৌকার ভেতর এক নারী শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। তার স্বামী জাল মেরামত করছেন। আরেক নৌকায় একজন নারীকে দেখা গেল অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতে। তাদের কারো চুলায় তখনো আগুন জ্বলছিল না।

> আরও পড়ুন- ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞায় হতাশ জেলেরা

মেঘনার পাড়ে হাঁটছি আর দেখছি, ইলিশের কোন খোঁজ পাই কি-না। গেলাম মতিরহাট ইলিশ ঘাটে। দেখা গেল এক আজব দৃশ্য। ইলিশ ঘাটের আড়তদাররা ইলিশ বিক্রির ধুম না থাকায় ঘুমাচ্ছেন! সামনে এগোতেই চোখ মেললেন আবদুল ওহাব ও নুরুল ইসলাম মুন্সি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘুম যান কেন?’ তাদের মুখ থেকে কষ্টমাখা উত্তর বের হতে দেরি হয়নি। বললেন, ‘কী আর করবো? দ্যাখেন না ভাই ঘাটের অবস্থা কি? কোন মাছ তো নাই। ঘুমানো ছাড়া আর উপায় কী?’

সেখান থেকে ফিরে নদীতীরে আরও একটু হাঁটা যাক। হঠাৎ দেখা মেলে দুই কিশোরের। মাছের একটি বাক্সে করে তারা মাছ আনছে। খুব কৌতূহল জাগলো মাছগুলো দেখার। দেখা মিললো, তিনটি ইলিশ আর কয়েকটি পোয়া মাছ। কিন্তু এতে যে তেলের খরচ ওঠেনি, তা তাদের দিকে তাকানোর পরই স্পষ্ট। আগামী দিনগুলো নদীতে ইলিশের দেখা না মিললে এসব মানুষের জীবন হয়ে উঠবে আরও কষ্টদায়ক।

এসইউ/পিআর