রাজনীতি

ভারতীয়রাই নিয়ে যাচ্ছে ১০ বিলিয়ন ডলার : ফখরুল

উন্নয়নের নামে ক্ষমতাসীন দলের ‘গুটিকতক’ মানুষের সুবিধার জন্যই গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘দেশের শিক্ষিতরা বেকার থাকলেও ভারত থেকে আসা কর্মীরা এ দেশ থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে।’

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর লেডিস ক্লাবে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ড্যাবের এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী চীন সফর নিয়ে যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সেখানে তিনি বলেছেন, উন্নয়ন পেতে হলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিতে হবে। অর্থাৎ মূল্য দিতে হবে। ফখরুল বলেন, ‘অবশ্যই আমরা জানি, উন্নয়নের একটা মূল্য দিতে হয়। সেই মূল্য দিতে হয় কার জন্য? সেই মূল্যটা দিতে হবে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য। আমরা ভালোভাবে দেখছি, আজকে যে উন্নয়নের কথা বলে যে টাকা জনগণের পকেট থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে, সেই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে শুধু গুটিকতক ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের সুবিধার জন্যই।’

তিনি বলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, এটা যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে আপনাদের কাছে দুটো পথ আছে। হয় আমরা এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলব, তাতে উন্নতি হবে না। আর যদি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নতি চান, … তো এটা তো মেনে নিতেই হবে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, শিল্পায়ন করতে হলে, বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হলে, সার উৎপাদন করতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। এলএনজি আমদানিতে আমাদের খরচ পড়ে ৬১ দশমিক ১২ টাকা। সেটা আমি দিচ্ছি ৯ দশমিক ৮০ টাকায়।

‘আজ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে কেন? এ গ্যাসের মূল্য এলএনজি আমদানি করে তার ভর্তুকি দেয়ার জন্য। এ এলএনজি কারা আমদানি করছেন? আজ এ সরকারের সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যারা মন্ত্রী অথবা উপদেষ্টা অথবা তাদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন তাদের জন্যই আজ বাড়তি যে খরচ, বাড়তি যে ব্যয় জনগণকেই করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার নয়। তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এ সংসদ নির্বাচিত হতে পারেনি কারণ তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। রাষ্ট্রের সব যন্ত্র ব্যবহার করে জোর করে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে। জনগণের কাছে এদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। গ্যাসের দাম বাড়লেই বা কি বা ভ্যাটের পরিমাণ বা ইনকাম ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়লেই বা-কী? এরা জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। তাদের একটি মাত্র লক্ষ্য সিটি হচ্ছে, তারা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেজন্য এক দশক ধরে সব আয়োজনকে সেভাবে সম্পন্ন করেছে।

বিএনপির এ মুখপাত্র আরও বলেন, আপনারা দেখেছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ক্রমান্বয়ে অত্যন্ত সুচতুরভাবে, পরিকল্পিতভাবে তারা সংবিধান পরিবর্তন করেছে। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের পরে তারা এ কাজটি শুরু করেছে। আজ এমন একটা জায়গায় সংবিধানকে নিয়ে এসেছে যে, কাটাছেঁড়া করে সেখানে গণতন্ত্রের কথা মুখে বলা হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোথাও গণতন্ত্র নেই। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ফখরুল আরও বলেন, ‘আজ বিচার বিভাগের কোনো স্বাধীনতা নেই। এ বিচার বিভাগ এমন একটা পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিচারের হুকুম বা রায় দিতে হয়। পাবনায় দেখেছেন আপনারা। পাবনায় ১৯৯৪ সালে বিরোধী দলের নেত্রীর (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ওপরে রেলে যে হামলা হয়েছিল, কোনো হতাহত হয়নি। আমরা সবসময় যেকোনো হামলা, যেকোনো সন্ত্রাসী ঘটনার প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু যেখানে কোনো হতাহতই হয়নি এবং তিন বছর পর চার্জশিট দেয়া হয়েছে, আজ ২৫ বছর পর সেই মামলার রায় দিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে নয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। যেখানে কোনো মৃত্যুই হয়নি। ২৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড। এই হচ্ছে বিচার বিভাগের অবস্থা।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মামলাগুলোর দিকে তাকালে আপনারা দেখতে পারবেন, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে সাজানো মামলা। কোথাও কোনো তছরুপ হয়নি, কোনো টাকা বাইরে চলে যায়নি, সেখানে আজ অন্যায়ভাবে শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং সেটাকে বাড়িয়ে আবার পাঁচ বছর থেকে ৭-১০ বছর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব মামলায় তিনি (খালেদা জিয়া) জামিন পাওয়ার যোগ্য কিন্তু তিনি জামিন পাচ্ছেন না। একই ধরনের মামলায় সবাই জামিন পাচ্ছেন কিন্তু দেশনেত্রী জামিন পাচ্ছেন না। তার বিরুদ্ধে ৩৬টি মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। এমনও মামলা আছে যে, একই সময়ে তিনটি থানায় গিয়ে বোমা মেরেছেন। এগুলো দিয়ে একটা জিনিসই প্রমাণিত হয় যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সরকার। কারণ তারা জানে যে, তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক, তিনি যদি বেরিয়ে আসেন জনগণকে নিয়ে চলতে থাকেন, তাহলে কোনোভাবে তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না এবং তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। সেজন্য তাকে বেআইনিভাবে ১৬-১৭ মাস আটক করে রাখা হয়েছে।

‘সরকার আজ দেশকে একটা পরনির্ভরশীল দেশে পরিণত করতে যাচ্ছে’- এমন অভিযোগ করে ফখরুল বলেন, আপনারা শুনেছেন আজ আমাদের দেশে শিক্ষিত যুবকরা চাকরি পায় না, কর্মসংস্থান নিচের দিকে নামছে। একদিকে উন্নয়নের কথা বলে, অন্যদিকে আমাদের ছেলেদের চাকরি নেই। অথচ একই সময়ে আজ ভারত থেকে কর্মীরা এসে, বিভিন্ন মানুষ এসে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশের বর্তমান যে সরকার ক্ষমতা দখল করে আছে তারা প্রকৃতপক্ষে জনগণের সরকার নয়। এরা একটা পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জনগণকে ‘জাগিয়ে’ তোলার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এজন্য জনগণের ঐক্যের খুব প্রয়োজন। আমাদের জনগণের মধ্যে চলে যেতে হবে, তাদের সংগঠিত করতে হবে। সব দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে যারা আজ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বিনষ্ট করছে, যারা আজ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে তাদের পরাজিত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছেন গণতন্ত্রের প্রতীক। তাকে মুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রের মা দেশনেত্রী মুক্ত হলেই শুধু গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। আমরা বলছি, এ সংসদ বাতিল করতে হবে এবং একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। তাহলেই জনগণের সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।

রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনের লেডিস ক্লাবে বিএনপির চিকিৎসক সংগঠন ড্যাবের ‘কেন্দ্রীয় সম্মেলন- ২০১৯’ অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন উড়িয়ে কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে দুপুরে ড্যাবের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ড্যাবের নতুন নির্বাচিত সভাপতি হারুন-আল রশিদ, মহাসচিব আব্দুস সালাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সেলিম, কোষাধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম শাকিল ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মেহেদী হাসানের নাম ঘোষণা করা হয়। গত ২৫ মে কাউন্সিলরদের ভোটে এ নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। এছাড়া কাউন্সিলের মাধ্যমে ড্যাবে যে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল তা বিলুপ্তি করা হয়।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ড্যাবের কমিটি ভেঙে অধ্যাপক ফরহাদ হালিম ডোনারকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি করে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ড্যাবের আহ্বায়ক অধ্যাপক ফরহাদ হালিম ডোনারের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব ওবায়দুল কবির খানের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক রফিকুল কবির লাবু, অধ্যাপক মোস্তাক রহিম স্বপন, এ কে এম মহিউদ্দিন ভুঁইয়া মাসুম, নবনির্বাচিত সভাপতি হারুন-আল রশীদ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সেলিম, কোষাধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম শাকিল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মেহেদী হাসান বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সদরুল, অধ্যাপক আখতার হোসেন খান, অধ্যাপক গোলাম কাদের দুলাল, অধ্যাপক সিরাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মামুন আহমেদ, অধ্যাপক আতিকুর রহমান, অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক লুৎফর রহমানসহ শতাধিক চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন।

কেএইচ/এমএআর/জেআইএম