ছেলের চাকরিচ্যুতি নিয়ে অভিমান করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা আগে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে একটি আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন তিনি। ওই চিঠিতে লেখা ছিল-‘জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে চাই না।’
চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টা পর বুধবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না নেয়া দিনাজপুরের সেই মুক্তিযোদ্ধার ছেলেকে চাকরি ফিরিয়ে দিয়েছে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যার দিকে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মাহমুদুল আলম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. লোকমান হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলামের চাকরির বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে আগে জানালে এত কিছু ঘটনা ঘটত না।’
এর আগে বৃহস্পতিবার দিনাজপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলামসহ তার পরিবারকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ডেকে নেন। সেখানে উপস্থিত সবার সামনেই জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, ‘যেই নিয়মে নুর ইসলাম চাকরি করতেন সেই নিয়মেই জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে চাকরি করবেন। সেই সঙ্গে নুর ইসলাম পরিবার নিয়ে যেই বাড়িতে থাকতেন সেখানেই তিনি থাকবেন।’
গত সোমবার দিনাজপুরের সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন তার ছেলের চাকরিচ্যুতি ও বাস্তুচ্যুতির বিষয়ে স্থানীয় সংসদের কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠি লেখার দুদিন পর গত বুধবার বেলা ১১টায় তিনি দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) জাগো নিউজে ‘পেটে লাথি মেরেছে ওরা, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা না হয়’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, ‘আমি বিষয়টি আগে থেকে জানতাম না। গতকাল চিঠিটি হাতে আসার পরই আমি পুরো বিষয়টি জেনেছি। শুক্রবার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আমি নুর ইসলামকে নিশ্চিত করেছি।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, যেই সরকারি বাড়িতে নুর ইসলামরা থাকতেন আমি তাদের সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তারা যেকোনো সময় বাড়িতে উঠতে পারবেন।’
চাকরি ফিরে পাওয়ার পর নুর ইসলাম বলেন, ‘ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি অনেক আফসোস করে বলেছেন, চাকরি তুমি ফিরে পেলে, কিন্তু বাবা তার শেষ সম্মানটুকু নিতে পারলেন না।’
নুর ইসলাম আরও বলেন, ‘তাকে ফের চাকরিতে যোগদান করতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে যে বাসায় তিনি থাকতেন, সেখানে থাকার অনুমতিও দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।’ এ বিষয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলে কাজে যোগ দেবেন বলে জানান তিনি।
দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ছেলে নুর ইসলাম সদর ভূমি কমিশনারের গাড়িচালক হিসেবে মাস্টার রোলে চাকরি করতেন। ছেলের চাকরিচ্যুতি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ওপর আক্ষেপ প্রকাশ করে নিজের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা আগে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে একটি চিঠি লিখে যান। সেই চিঠিতে তিনি লেখেন, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে চাই না। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিও।
এসআর