মতামত

পেঁয়াজ সংকট থেকে কি আমরা কিছু শিখবো?

কিছু কিছু সংকট আছে অনিবার্য। যেমন প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায় হয়ে যাই। এই যে কদিন আগে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল' ধেয়ে এলো। আমরা কী করতে পেরেছি? ১০ নাম্বার মহাবিপদ সঙ্কে ত দিয়েছি, মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে এনেছি, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তি দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছি। অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশকে প্রায় নিয়মিতই প্রবল ঘূর্ণিঝড় বা ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করতে হয়। তাই দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা দারুণ দক্ষতা অর্জন করেছি। ঝড় যত প্রবলই হোক, অন্তত প্রাণহানী ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনা গেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করলেও মানবসৃষ্ট অনেক দুর্যোগের কাছে আমরা অসহায়। এই যেমন এখন দেশে পেঁয়াজের যে সংকট চলছে, তা একদমই মানুষের সৃষ্ট।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমাদের আমাদের চোখের সামনে, আমাদের খামখেয়ালিতে পেঁয়াজ সংকট ধীরে ধীরে বুলবুলের মত ঘণীভূত হয়েছে। এখন তা বাজারে মহাবিপদ সঙ্কেত দিয়েছে। অথচ অন্তত তিন মাস আগেই পেঁয়াজের বাজার সঙ্কেত দিচ্ছিল। ব্যবসায়ীরা তখন থেকেই সঙ্কটের কথা বলাবলি করছিলেন। বিপদটা দৃশ্যমান হয়, যখন ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে দেয়। আর যখন ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তখন সঙ্কট ঘনীভূত হয়। তখন থেকে সতর্ক হলে সঙ্কট আজ এত প্রকট হতো না। ভারত রপ্তানি বন্ধের পরও দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। তখনই বিকল্প বাজার বা আমদানির উদ্যোগ নিলে আজ পেঁয়াজকে ভিআইপি মর্যাদায় বিমানে করে আনতে হতো না। কিন্তু তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি বা বোঝার চেষ্টা করেনি। যদি করতো, তাহলে আজকের অবস্থা হতো না।

বাংলাদেশে পেঁয়াজের সংকটের সাথে ভারতের একটা যোগাযোগ আছে। বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানির ৯৯ ভাগই আসে ভারত থেকে। তাই ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে সঙ্কট তৈরি হয়। তবে ভারত যে ইচ্ছা করে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলার জন্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বন্যার কারণে ভারতে এবার পেঁয়াজ উৎপাদন কম হয়েছে। ভারতের বাজারেও পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করে। তাই ভারত নিজেদের বাজার সামাল দেয়ার জন্যই রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু রপ্তানি বন্ধ করেই বসে থাকেনি ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দেশ ভারত এখন পেঁয়াজ আমদানি করছে।

আসলে ভারতে পেঁয়াজ একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক চরিত্র। পেঁয়াজের দাম বাড়লে যে সঙ্কট তা এমনকি সরকার পতন পর্যন্ত যেতে পারে। তাই তারা কোনো ঝুঁকি নেয়নি। আর আমরা সমস্যার গুরুত্বটা বুঝতেই পারিনি। বুলবুল আস্তে আস্তে ঘনীভূত হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় হলেও আমাদের প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার থাকে না। কিন্তু পেঁয়াজের সমস্যাটা আমরা চাইলে অনেক আগেই সমাধান করতে পারতাম। বুলবুল প্রবল ঘূর্ণিঝড় হলেও শেষ পর্যন্ত সুন্দরবন বুকে আগলে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে বলে যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ক্ষতি ততটা হয়নি।

পেঁয়াজও আমাদের অপরিহার্য সবজি নয় বলে সঙ্কট যতটা জটিল প্রভাব তেমন পড়েনি। পেঁয়াজ সঙ্কটের প্রভাবে তুলনায় তুলনায় গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হইচই বেশি হয়েছে। তবে পেঁয়াজ সঙ্কটের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো, সঙ্কট সৃষ্টির সক্ষমতা। যারা বাজারে সরবরাহ কম থাকার সুযোগ কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে পেঁয়াজের দামে বিশ্বরেকর্ড করে ফেললো, এটা একটা টেস্ট কেস হতে পারে। তারা বুঝিয়ে দিলো, চাইলে তারা সবকিছু নিয়েই এমন সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার কথা হলো, এখন চালের বাজারে সঙ্কটের হালকা সতর্ক বার্তা শোনা যাচ্ছে। আমরা কি পেঁয়াজ থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই চালের বাজারে সতর্ক হবো? আমার কিন্তু যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

আমাদের সবগুলো মন্ত্রণালয়ের আলাদা আলাদা দায়িত্ব আছে। কখন কোন ফসল চাষ হচ্ছে, কোথায় ঝড়ে কোন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় বন্যায় ফসল ডুবে যাচ্ছে, কোথায় বাড়তি সেচ লাগবে, সার লাগবে এটা অবশ্যই কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানতেই হবে। এটাই তাদের কাজ। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানতেই হবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা, মজুদের অবস্থা। সে অনুযায়ী তারা সিদ্ধান্ত নেবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানতেই হবে কখন কোন পণ্য আমদানি করতে হবে। এমনকি একই পণ্য কখনো আমদানিতে উৎসাহ দিতে, কখনো বিমানে আমদানি করতে হয় আবার কখনো আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে হয়। এই টাইমিংটা ঠিক করাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ। যেমন এখন যে পেঁয়াজ বিমানে করে আনতে হচ্ছে। ঠিক ২০ দিন পর কিন্তু আবার পেঁয়াজ আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে হবে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যখন নতুন দেশী পেঁয়াজ বাজারে আসবে তখন আমদানিতে রাশ টানতে না পারলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তখন আবার কৃষকরা দাম না পেয়ে হাহাকার করবে।

প্রতিবছরই একই ঘটনা ঘটে। নতুন ধান বাজারে এলে এক মণ ধানের একটা ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। গতবছর কৃষকরা দাম না পেয়ে মাঠে ধান পুড়িয়েছে। সংকট সৃষ্টির জন্য অনেকেই গণমাধ্যমকে দায়ী করেন। বলেন, গণমাধ্যম এত হইচই করে বলেই দাম বেড়ে যায়। কিন্তু গণমাধ্যম তো মিথ্যা তথ্য প্রচার করে না। বরং গণমাধ্যম সমস্যা তুলে ধরে বলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়। গণমাধ্যমে লেখা হলেই চাল আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়। অথচ কৃষি, খাদ্য এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ের আলাদা ক্যালেন্ডার থাকার কথা। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের আগেই তো তাদের এসব কাজ করে ফেলার কথা। কখন চাল আমদানিতে উৎসাহ দিতে হবে, কখন শুল্ক বাড়াতে হবে; এটা মিডিয়ার আগেই মন্ত্রণালয়কে জানতে হবে। তাহলেই আর সমস্যা সৃষ্টি হবে না।

পেঁয়াজ সঙ্কট যেটা হয়েছে, আগে থেকে সতর্ক থাকলে সেটা এড়ানো যেতো। এখন যে অবস্থা তাতে পাইপলাইনে থাকা পেঁয়াজ আসলে এবং নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসলে শিগগিরই এই সঙ্কট কেটে যাবে। কিন্তু আমরা যেন পেঁয়াজের সংকট থেকে শিক্ষা নেই। যেন ভবিষ্যতে চাল, পেঁয়াজ, আটা, তেল- কোনো নিত্যপণ্য নিয়েই কোনো সংকট তৈরি না হয়। বাজার ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং যেন সময়মত হয়। এই সংকট থেকে এই হোক আমাদের শিক্ষা।

এইচআর/পিআর