দেশজুড়ে

পরের জমিতে ধান চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তারা

পটুয়াখালীর গলাচিপার ইউনিয়নের ভাঙ্গা গ্রাম এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী। বয়স্ক মা, স্ত্রী ও সন্তান মিলিয়ে সংসারে সদস্য ৬ জন। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কেবলই তিনি। নগদ টাকায় পরের জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করছেন। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধান পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন। নিজ সন্তানের মতো করে যত্ন করেন। কয়েক বছর ধরে এভাবেই ধান চাষ করছেন। সেই ধান বিক্রি করে সংসারের স্বচ্ছলতা এনেছেন। তাই ধানকে মনে করেন সোনার খনি। 

তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি করা (৪ শতাংশ) জমি একসনা (প্রতিবছর টাকার বিনিময়ে) ৪০০ টাকা দরে এবং পাঁচ বছরের জন্য ১ হাজার টাকা চুক্তিতে নিয়ে চাষাবাদ করেন। প্রতি প্যাকেট বীজ ৫শ টাকা, প্রতিজন বদলা প্রতিদিন ৫শ টাকা হাজিরাসহ দুই বেলা খাবার দিতে হয়। এক কানি (৭.২৫ বিঘা) জমি ট্রাক্টর দিয়ে চাষের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং কীটনাশক দিতে ৮ হাজার খরচ করতে হয়। এরপর প্রতি কানিতে বাম্পার ফলন হলে ৮০ থেকে ১শ মণ ধান উৎপাদন হয়। আর ফলন খারাপ হলে হয় ৫০ থেকে ৬০ মণ। 

সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে ধান ক্ষেত। কোথাও চলছে শেষ সময়ের পরিচর্যা, আবার কোথাও ধান কাটায় ব্যস্ত চাষিরা। 

গবেষক মো. রেজাউল করিম জানান, ৩৩ শতাংশে এক বিঘা, এককানিতে ৭.২৫ বিঘা আর ৩ বিঘা সমান এক একর জমি। 

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কৃষক সেলিম হাওলাদার জানান, ধান চাষের জমি তৈরি পর থেকে কাটা পর্যন্ত প্রতিদিন কাজ করতে হয়। এরমধ্যে বীজ রোপন, ধানের গোড়া পরিষ্কার করা, পোকার আক্রমণ হলে কীটনাশক ছিটানো, হেরি-কাঁচা ঠিক রাখাসহ মাঝে মাঝে সেচও দিতে হয়। তবে অসময়ে বৃষ্টিপাত বা ঘূর্ণিঝড় হলে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ফলন কম হয়। 

কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য ফড়িয়া (মধ্যস্বত্বভোগী) আছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে বেপারিদের (বড় ব্যবসায়ী) বিক্রি করে। লাভের টাকায় সংসার চালায়, আবার জমিও কেনে। তবে প্রকৃত কৃষকরা ধানের টাকায় জমি কিনতে পারেন না। সংসারের খরচ মিটাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। তবে যারা অনেক জমির মালিক তারা নিজেরা এখন আর চাষাবাদ করেন না। প্রতিবছর টাকার বিনিময়ে কৃষকদের কাছে ভাড়া দেন। 

সদর উপজেলার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রথমে দুই জৈষ্ঠ্য (৪০ করা) জমি দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছিলাম। ধান বিক্রি করে খরচের পর যে লাভ হয়েছিল তা দিয়ে অল্প আবাদি জমি কিনেছিলেন। এখন তিনি দেড় কানি জমির মালিক। এ বছর মোটা আমন ও ইরি ধান চাষ কছেন। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে কিছু ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সরকার কর্তৃক আমন সংগ্রহের কথা শুনে ভালো দামের আশা করছেন। বলেন, ‘প্রতি মণ ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারলে আল্লাহর রহমতে এবার লাভবান হব। 

এমন কাহিনী শুধু কৃষক দেলোয়ারের একার নয়। কৃষক মোহাম্মদ আলী, সেলিম হাওলাদারসহ আরও অনেকের। তারাও পরের জমিতে ধান চাষ করে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে তা দিয়ে এখন নিজেরাই জমির মালিক হয়েছেন। তবে এখনও তারা পরের জমি এক বা পাঁচ বছরের জন্য নগদ টাকায় রেখে চাষাবাদ করেন। 

মহিব্বুল্লাহ্ চৌধুরী/এমএমজেড/এমকেএইচ