মতামত

বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত বিপিএল : আমাদের যেন বদনাম না হয়

বিপিএল ঘিরে একটা জন আবেগ আছে। তার উপর এবার বিপিএলের সাথে যোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নাম। বিপিএলের সাথে কেন বঙ্গবন্ধুর নাম? এমন প্রশ্ন যদি কারও মেন জাগে, তাদের জন্য উত্তরটা পরিষ্কার। আগামী বছর জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। উদযাপিত হবে দেশজুড়ে। শুধু দেশ নয়, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে। বঙ্গবন্ধু- শব্দের আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, তিনি শুধু বাংলাদেশ আর বাঙালির নেতা ছিলেন তা নয়। সে কারণে সত্তর দশকের গোড়ার দিকে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দু'ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।' বিশ্বে সেই বিভাজন রেখে কী মুছে গেছে! মনে হয় না। তাই তাঁর মৃত্যুর চুয়াল্লিশ বছর পরও তাঁর উক্তি সমকালীন। বঙ্গবন্ধুও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কেন বিপিএলে?

বিপিএল দূর অস্ত। বঙ্গবন্ধুর জীবত অবস্থায় স্বপ্নেও টি-টোয়েন্টি উঁকি দিত না এদেশের মানুষের মনে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জায়গা পায়নি। কিন্তু ক্রিকেট নামক খেলাটা বাঙালি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে পারছে, সেটা বঙ্গবন্ধুর সৌজন্যে। বিস্মিত হচ্ছেন? হতেই পারেন। কিন্তু কী আর করা। কথাটা লিখতেই হচ্ছে। এই ভদ্রলোকের জন্ম না হলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক দেশটার জায়গা হতো না। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনে কোন কোন বাঙালি টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি। এমন কী আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলারও সুযোগ পাননি। তাই '৭১ এর ১ মার্চ পাক প্রেসিডেন্ট যখন অনির্দিষ্ট কালের জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করলেন, তার লক্ষ্য ছিল একটাই বাঙালি যাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ শাসনের দায়িত্ব নিতে না পারে।

সেদিনই ক্রিকেট মাঠে আগুন জ্বালিয়ে ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সেদিনের ঢাকা স্টেডিয়াম, আজকের বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম থেকে প্রতিবাদের মিছিল বেরিয়েছিল। যে মিছিলের একটা অংশ ছুটে গিয়েছিল পূর্বাণী হোটেলে যেখানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি এবং নির্বাহী কমিটির সভা করছিলেন। এরপর দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে যখন ক্রিকেট সামগ্রী আমদানীর উপর কর আরোপ করা হলো, তখন ক্রিকেটার আর ক্রিকেট সংগঠকরা ছুটে গেলেন সেই বঙ্গবন্ধুর কাছে। তিনি বললেন, বাজেট করেছেন অর্থমন্ত্রী। তোমরা অর্থমন্ত্রীর কাছে যাও, আমি বলে দিচ্ছি। তিনি সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে ঠিকই বলেছিলেন; কর যতটা সম্ভব কমাতে। তারপর ক্রিকেট গড়ালো ঢাকা স্টেডিয়ামে।

বঙ্গবন্ধু দেখে যেতে পারেননি, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাফল্য। শুধু ক্রিকেট কেন, বঙ্গবন্ধু এবং তার গোটা পরিবার ছিল ক্রীড়াপ্রেমী। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হলো, তখনও সেই বাড়িতে খান দুয়েক ব্যাট, একটা বল এবং স্টাম্প ছিল। যা বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে এখনও সংরক্ষিত আছে। আর সেটা দেখে ভারতের সাবেক অধিনায়ক এবং বর্তমান ভারতীয় দলের কোচ বছর চারেক আগে বিস্ময় ভরা চোখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন; বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে ক্রিকেটেরও সম্পর্ক ছিল!' ' হ্যাঁ, ছিল। কারণ, তাঁর দুই ছেলেই ক্রিকেট খেলতেন। ' উত্তরটা দিতে হয়েছিল এই লেখককেই। বঙ্গবন্ধুর সাথে ক্রিকেটের সম্পর্কের চেয়ে বড় কথা; বিপিএল এর অর্থ যদি হয় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ, তাহলে একটা কথাই বলতে হবে; বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক দেশটারই জন্ম হতো না। তার জন্মবার্ষিকীতে বিপিএল যদি তাঁর নামাঙ্কিত হয়, তাহলে কিছুটা শ্রদ্ধাা দেখানো হবে তাঁকে ক্রিকেটাঙ্গন থেকে তাঁর জন্ম শতবার্ষিকীর আগে।

তবে বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে যদি তিনি স্বর্গ থেকে দেখেন তাঁর নামের এই টুর্নামেন্টে ভাল খেলছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশে বিদেশী তারকারাও আসবেন বিপিএল খেলতে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাফল্য পেতে হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। তার জন্য অবশ্য দরকার অবিশ্বাস্য পরিশ্রম। গ্রানাইটের মতো শক্ত মানসিকতা। তা হলেই ধীরে ধীরে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তাদের পারফরম্যান্সকে। এবারের বিপিএলে দেখা যেতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটে পেশাদারি কাঠিন্যের কতটা আমাদনি ঘটেছে। কতোটা উন্নত হয়েছে বাংলাদেশ। তাছাড়া; আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে ওয়ার্ল্ড আইসিসি চ্যাম্পিয়নিশপ। তার প্রস্তুতিও হতে পারে ; এবারের বিপিএল।

দক্ষতা যখন সমান-সমান হয়ে যায়, তখন মানসিকতাই ফারাক গড়ে দেয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা স্রেফ স্নায়ুর লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন, সেটাই প্রমাণ হোক, এবারের বঙ্গবন্ধু বিপিএলে। তাহলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হবে ক্রিকেট মহল থেকে। আর বঙ্গবন্ধুর আত্মাও শান্তি পাবে। বাঙালি হারতে জানে না। হারতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনের মধ্যে সেটা পরিষ্কার ছিল। সেই জীবন-দর্শন শুধু রাজনীতির ময়দানে নয়, ক্রিকেট মাঠেও সত্যি প্রমাণ করার দায়িত্ব এখন ক্রিকেটারদের। জীবন মানে এক অদম্য আশাবাদের আখ্যান। ভয়ঙ্কর যুদ্ধে জিততে চাই অদম্য লড়াই, অপরাজেয় মানসিকতা, নির্ভুল একাগ্রতা, উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস। আমরা আমজনতা অবশ্য এখন শুধু আশা করতে পারি; দুর্দান্ত একটা বিপিএলের। কারণ এবারের বিপিএলের সাথে জড়িয়ে আছে জাতির পিতার নামটা। বঙ্গবন্ধুর আরেকটা বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই সেই আশাবাদের কথা; ‘মনে রাখবা। আমাদের যেন বদনাম না হয়।'

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস