দেশজুড়ে

‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই আমাকে যুদ্ধে পৌঁছে দেয়’

‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার মনোবল সৃষ্টি করে ও শেষ পর্যন্ত আমাকে যুদ্ধে পৌঁছে দেয়। উচ্চ মাধ্যমিক ফাইনাল ইয়ারেই যুদ্ধে চলে যাই। ওই বছর পরীক্ষা দেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর সাতক্ষীরা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। আমি ওই কমিটির সদস্য ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত সংগ্রাম কমিটির ট্রেজারার ছিলেন এম এন এ আব্দুল গফুর। আমি প্রায়াত মুক্তিযোদ্ধা ইনামুল, আমিনুর রহমান (সাদা খসরু), হাবলুসহ অনেকে সাতক্ষীরার ভোমরাতে গিয়ে ক্যাম্প করি। এভাবেই আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার বিষয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহম্মেদ রবি। বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর-২ আসনের সংসদ সদস্য। শহরের মুনজিতপুর এলাকার বাসিন্দা তিনি।

আলাপকালে মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহম্মেদ রবি বলেন, আমরা শপথ নিলাম, যুদ্ধ করব। দেশকে স্বাধীন করব। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের (এসডিও) কাছ থেকে চাবি নিয়ে অস্ত্রাগার থেকে আমার পিতা মীর ইশরাক আলী ইসু মিয়া ও রাজা চাচা অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনেন। রাজা চাচা নেভিতে চাকরি করতেন। রাজ্জাক পার্কে রাজা চাচা আমাদের ট্রেনিং করান। ট্রেনিং শেষে আমরা ভোমরায় চলে যাই। সে সময় এনএসএফের একটা অংশ মুক্তিযুদ্ধে সাপোর্ট করতেন। আমাদের সঙ্গে রেগুলার ফোর্স ছিল না। আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর, পুলিশ পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাতক্ষীরা প্রথমে আর্মি আসেনি। তৎকালীন এসডিও খালিদ মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল আর্মির প্রয়োজন আছে কি-না? তিনি বলেছিলেন, না। সাতক্ষীরার মানুষ শান্ত। পরে যখন ব্যাংক লুট হয় এসডিওকে আটক করলাম আমরা। এসডিওকে অনেকে চেয়েছিল মেরে দিতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেটা চায়নি। পরে সাতক্ষীরায় আর্মি আসলো। আমরা ভোমরা ছেড়ে ভারতের বশিরহাটের ইউথ রিভিসশান ক্যাম্পে চলে গেলাম। সেখানে মেজর জলিল আসলেন। তিনি বললেন, তোমরা শুধু খাচ্ছ আর ঘুমাচ্ছো। এর আগে মেজর জলিলকে চিনতাম না। আমরা বললাম, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতে এসেছি। তখন মেজর জলিল বললেন, আমি এসেছি তোমাদের তৈরি করতে। নবম সেক্টর চালাতেন মেজর জলিল।

মীর মোক্তাক আহম্মেদ রবি বলেন, ছাত্র রাজনীতি থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। ভাগীরথী নদীর (পলাশীর) তীরে ভারতের নেভির তত্ত্বাবধায়নে আমি ট্রেনিং নিয়েছিলাম। আমদের ট্রেনিং শেষে ৮টি গ্রুপ করে মোংলা, চিটাগং, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, পাকশী ও সিলেটের ধামাইয়ে পাঠানো হয়। সিলেটের মৌলভীবাজারের ধামাইয়ে আমি ক্যাম্প কমান্ডার ছিলাম। মোংলায়ও যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধ শেষে ফিরে দেখি আমাদের দুটি বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। যুদ্ধের সময় পরিবার ছিল ভারতে। যুদ্ধের পর ৭৩ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হই। দুই বছর অধ্যায়নের পর পড়াশুনা শেষ না করেই সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে চলে আসি। ভিপি নির্বাচিত হই।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৪-৫ বার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ’৭৩ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আমাকে সাতক্ষীরার পাঁচটি আসনের প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে তার নজরে পড়েছিলাম। ৩২ নম্বরে, তৎকালীন পার্লামেন্ট ভবন ও গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৪-৫ বার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি আমার মুখে চুমু দিয়েছিলেন। মনে পড়লে শরীরে আজও শিহরণ জাগে।

আকরামুল ইসলাম/এমবিআর/জেআইএম