ফিচার

মোটরসাইকেলে পাহাড়ের ৯শ বেকারের কর্মসংস্থান

এখন শীতকাল। চারিদিকে কুয়াশা। সকাল বা সন্ধ্যা হলেই পাহাড়ের চারপাশের গ্রামগুলো সাদা কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। তবুও সকাল হলেই জীবিকার প্রয়োজনে বের হতে হয়ে রুটি-রুজির সন্ধানে। এ দুর্গম এলাকায় একমাত্র যানবাহন মোটরসাইকেল। কোন ছোট কিংবা বড় গাড়ি সেখানে যেতে পারে না। তাই দুর্গম পথকে পুঁজি করে মোটরসাইকেল চালানোকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন তারা।

তাদেরই একজন মোহাম্মদ আলী। থাকেন লামা পৌরসভার সাবেক বিলছড়ি এলাকায়। লামা রূপসীপাড়া সড়কের মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি তিনি। অভাবের তাড়নায় লেখাপড়ায় তেমন এগোতে পারেননি। পঞ্চম শ্রেণি থেকে ছিটকে পড়েন। তাই অল্প বয়সে হাল ধরতে হয় পরিবারের। আগে দর্জির দোকান ছিল। সেই আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেত হতো। এখন তিনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান। দিনে আয় করেন ৮০০-১৪০০ টাকা। সংসারের চাহিদা মিটিয়ে সঞ্চয়ও করেন।

শুধু মোহাম্মদ আলীই নন, মোটরসাইকেল চালানোকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন সরই ইউনিয়নের ক্যায়াজুপাড়া এলাকার শফিকুল ইসলাম ও শেখ মোহাম্মদ। তারা জানান, অভাবের কারণে লেখাপড়া থেকে আগেই ছিটকে পড়ে চায়ের দোকান করতেন। এতে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। বিকল্প কর্মসংস্থান না হওয়ায় এখন মোটরসাইকেলে যাত্রী বহনকেই তারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এখন ভালো আয় হয়।

এভাবে উপজেলার প্রায় ৯শ’ বেকার কর্মসংস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন মোটরসাইকেল চালানোকে। শুধু যুবক নয়, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্করাও আছেন এ পেশায়। ভাড়া একটু বেশি হলেও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রীরা বিকল্প যান হিসেবে মোটরসাইকেলে চড়তে পছন্দ করেন। দিন বা রাত যেকোনো সময়ে সাড়া দেন তারা। দুর্গম পাহাড়ি যেসব এলাকায় গাড়ি যেতে পারে না; সেসব এলাকায়ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে পারছেন স্থানীয়রা।

মোটরসাইকেলের যাত্রী মো. ফরিদ উদ্দিন, রিয়াজ, পিন্টুসহ অনেকে জানান, পাাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। এ কারণে তারা নিরুপায় হয়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে যাতায়াত করেন। রাত-বিরাতে তাদের ফোন করলেই পাওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানান, এসব রাস্তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম। অনেক সময় অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে চাইলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তখন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ভোগান্তি দূর করে। তবে চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে দুর্ঘটনা কমে যেত। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে সমিতি গঠন করেছেন চালকরা। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভিন্ন সড়কে রাখা হয়েছে লাইনম্যান।

লামা বাজার মিশনঘাট, পূর্বপাড়া, মেরাখোলা সড়কের মোটরসাইকেল সমিতির সভাপতি ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘উপজেলা ও পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড আছে। যার মধ্যে উপজেলা সদরে রয়েছে ৩টি স্ট্যান্ড। এখান থেকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভাড়ায় যাত্রী বহন করা হয়। তবে গরিব-অসহায় মানুষকে আমরা বিভিন্নভাবে আর্থিক সহায়তা করে থাকি।’

সরই মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি আবদুল জব্বার বলেন, ‘আমি অনেক কাজ খুঁজেছি, পাইনি। এখন সংসার চালাতে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাই। প্রতিদিন গড়ে ১৩০০ টাকা আয় হয়। সব খরচ বাদে ৮০০ টাকা থাকে। এতে সংসার ভালোই চলে।’

লামা পৌরসভার মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বেকার না থেকে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে যারা মোটরসাইকেল চালান; তাদের পরিচয়পত্র, প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট পোশাক থাকা প্রয়োজন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেলের বিকল্প নেই। এতে বেকারত্বও কমছে। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালকদের দুই দিনের ট্রাফিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’

সৈকত দাশ/এসইউ/পিআর