দেশজুড়ে

শীতের রাতে রেলস্টেশন-বাসস্ট্যান্ড-বস্তিবাসীর খোঁজে ডিসি

মানুষের নানাবিধ সুবিধা আর আর্থসামাজিক উন্নয়নের ছোঁয়ায় ক্রমেই বাংলাদেশ থেকে দূর হচ্ছে রাতের আঁধার। গোধূলিলগ্ন শহরাঞ্চল এখন তেমন দেখা যায় না। রাতে চাঁদ ওঠে; শহরবাসী তা দেখে বিদ্যুতের আলোর ফাঁকে ফাঁকে। শহরের রাস্তাঘাট গভীর রাতেও থাকে আলো ঝলমল। ইদানিং গ্রামাঞ্চলেরও একই অবস্থা।

মৌলিক চাহিদা পূরণে যখন দায়িত্বশীল সদা সতর্ক তখন অভাব খুঁজে পাওয়া দায়। তবে এত কিছুর পরও কখনো কখনো কোনো কোনো মানুষের জীবনে নেমে আসে রাতের আঁধার। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যতই আলোর ঝলকানি থাক না কেন, গহীনে তার অন্তরজ্বালা বিরাজ করে। এমন জ্বালা কখনো দীর্ঘস্থায়ী আবার কখনো সাময়িক। যেমন- ছাতা মেরামত করার কারিগরদেরও হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। হাজার কোটি টাকার গাড়ির যাত্রীকেও কখনো কখনো যান্ত্রিক ত্রুটিতে হেঁটে রাস্তা পার হতে হয়।

বেকায়দায় পড়লে চাতাল মালিকদেরও না খেয়ে থাকতে হয়। সুস্থ দেহের অধিকারীও হঠাৎ স্ট্রোকে মারা যান। এসব কিছুই ব্যতিক্রম ঘটনা। ব্যতিক্রম কখনো স্বাভাবিক হিসেবে আসে না; আসার কথা নয়। কিন্তু কখনো কখনো কোনো কোনো মানুষ এসব ব্যতিক্রমকেও স্বাভাবিকভাবে আনতে চেষ্টা করেন। নিজেদের স্বাভাবিক স্রোতে মেশাতে চান। এমনই একটি ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে।

কয়েক দিনের তীব্র শীতে ফরিদপুর শহর ও গ্রামগুলোর রাস্তাঘাটে লোকজনের আনাগোনা ছিল কম। সন্ধ্যার পর সে সংখ্যা আরও কমে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতবাড়ির বাইরে লোকসংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা।

বৃদ্ধের হাতে কম্বল তুলে দিলেন ডিসি

এমন রাতেই ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) অতুল সরকার বের হলেন। সঙ্গে নিলেন কয়েকটি পিকআপভর্তি কম্বল। ছুটে গেলেন রেলস্টেশনে। সেখানে কয়েকজন প্রতিবন্ধী আর অসহায় বৃদ্ধা। কম্বলে মুড়িয়ে দিলেন তাদের শরীর। হেটে এগিয়ে চললেন রেল বস্তির দিকে; যদিও এখন আর আগের মতো বস্তির বাসিন্দা নেই; তবুও শীতার্ত যাদের পাওয়া গেল তাদের গায়ে কম্বল মুড়িয়ে দিলেন ডিসি।

এরপর চৌরাস্তা বেড়িবাঁধের স্লুইসগেটসংলগ্ন শীতার্তদের কম্বল তুলে দিলেন তিনি। তারপর ধলার মোড়ে বটতলা, গোয়ালচামট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে অসহায় ও গরিব-দুঃখী মানুষের হাতে কম্বল তুলে দিলেন ডিসি।

মহিম স্কুলের মার্কেটের বারান্দায় দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ওখানে প্রায় শ’ খানেক লোক মাকের্টের বারান্দায় খোলা বাতাসের মধ্যে ঘুমাচ্ছিলেন। কারও গায়ে কাঁথা, কারও পাতলা চাদর। প্রত্যেকের গায়ে কম্বল দিলেন জেলা প্রশাসক।

অতঃপর গন্তব্য নতুন বাসস্ট্যান্ড। প্রচণ্ড শীতেও গেঞ্জি গায়ে পানি দিয়ে বাস পরিষ্কার করছেন অংসখ্য লোক। প্রত্যেককে তুলে দিলেন কম্বল। কিছুদূর এগিয়ে টিকিট কাউন্টারের বারান্দায় দেখা গেল শ’ দেড়েক লোক শুয়ে আছেন। কথা বলে জানা গেল দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এরা এসেছেন কাজের জন্য। থাকার জায়গা না থাকায় এখানেই তাদের রাতের ঘুম। অধিকাংশের লেপ বা কম্বল নেই। তাদেরও কম্বল দিলেন ডিসি।

শীতার্ত মানুষের হাতে কম্বল তুলে দিচ্ছেন ডিসি অতুল সরকার

জেলা প্রশাসক এক হাজার কম্বল নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিছু কম্বল তখনো রয়ে গেছে। এবার কম্বলগুলো নিজের গাড়িতে নিয়ে ছুটলেন রাস্তায় রাস্তায়। গোয়ালচামট পরিচর্যা হাসপাতালের পশ্চিম পাশে রাস্তার সাইডে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করছিলেন এক মধ্য বয়সী; তাকে ডেকে কম্বল দিলেন ডিসি।

হাজরাতলা রাস্তায় দোকানে বাজার-সদাই আনতে যাচ্ছিলেন এক বৃদ্ধ। গায়ে কোনো শীতের কাপড় নেই। শুধু একটি কাপড় পরা, টেপাখোলা বাজার থেকে কুমার নদের পাড় দিয়ে সামনে এগোলে টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে এক মাদরাসাছাত্র- এভাবে খুঁজে খুঁজে সবার হাতে কম্বল তুলে দেয়া হলো। শীত আর কুয়াশা উপেক্ষা করে মধ্যরাত পর্যন্ত শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণের চেষ্টা করেছেন জেলা প্রশাসক।

এ সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গী হয়েছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রোকসানা রহমান, কয়েকজন স্টাফ ও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী সদস্য।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) অতুল সরকার বলেন, অসহায় মানুষের পাশে সবসময় রয়েছে জেলা প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রচণ্ড শীতে কাতর মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি আমরা। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

বি কে সিকদার সজল/এএম/জেআইএম