বগুড়ায় সেশন ফির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। শহরের প্রায় প্রতিটি স্কুলেই আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। আদালতের নির্দেশিত ২ হাজার টাকার স্থলে নেয়া হচ্ছে ৬ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
বিষয়টি তদারকির জন্য হাইকোর্ট জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিলেও তাদের তৎপরতা দায়সারা। আর সেই সুযোগে অভিভাবকদের গলা কাটছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
স্কুলে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন বগুড়ার বিশিষ্ট সমাজসেবী আবদুল মান্নান। এর প্রেক্ষিতে গত ২ জুলাই আদালত অতিরিক্ত অর্থ আদায়কে অবৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে টাকা ফেরত দিতে সব স্কুল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশনা মানা হয়নি কোনো স্কুলেই। উল্টো ২০২০ সালের জন্য চলতি মাসেই (ডিসেম্বর) অতিরিক্ত সেশন ফি আদায় করা শুরু হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রকে সেশন ও অ্যাডভান্স ফি বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪ হাজার ১৮০ টাকা। অথচ, আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক আংশিক এমপিওভুক্ত ওই বিদ্যালয়ে সেশন ফি হওয়ার কথা ২ হাজার টাকা।
একইভাবে শহরের ইয়াকুবিয়া বালিকা বিদ্যালয়ে ২ হাজার টাকার স্থলে সেশন ফি নেয়া হয়েছে ৬ হাজার টাকা। আর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৪ থেকে ২২ হাজার এবং বিয়াম মডেলে ৮ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। শহরের নামীদামি এসব স্কুলের মতো একই চিত্র প্রায় প্রতিটি স্কুলেরই।
স্কুল-কলেজগুলোর জুলুম-নির্যাতনের কথা বর্ণনা করে বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবু তালেবুল হাসান বলেন, কয়েক বছর আগে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ টানা ৬ মাস বন্ধ ছিল। খোলার পর আমাকে ৬ মাসের বাস ভাড়া পরিশোধ করার চাপ দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তখন প্রতিবাদ করে বলি, আপনাদের বাসতো গত ৬ মাসে একদিনও রাস্তায় নামেনি, তারপরও কেন ভাড়া দিতে হবে? তখন কর্তৃপক্ষ সন্তানকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়েই সেই টাকা পরিশোধ করি।
আরেক অভিভাবক জানান, অতিরিক্ত সেশন ফি ছাড়াও বাজারের চেয়ে চারগুণ থেকে পাঁচগুণ বেশি টাকায় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বই, খাতা, ব্যাগ, টাই, ব্যাজসহ শিক্ষা উপকরণ কিনতে বাধ্য করা হয়। এমন কি ড্রেসও প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে হয়। নামীদামি এসব স্কুল কলেজে একবার কাউকে ভর্তি করা হলে পর্যায়ক্রমে নানা বাহানায় একের পর এক খাত দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
অভিভাবকরা আরও জানান, স্কুলের রশিদ বইও শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হয়। বিদ্যুৎ বিল, কম্পিউটার ল্যাব, খেলাধুলা, পাঠাগার, নেম প্লেট, কেন্দ্র ফি, দরিদ্র তহবিলসহ সিলেবাস ও প্রসপেক্টাস ফিও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়।
আবার এমন অনেক স্কুল আছে যারা গত পাঁচ-দশ বছরেও ম্যাগাজিন প্রকাশ না করলেও প্রতি বছর এর জন্য ফি নিচ্ছে। সেই সঙ্গে ফি নেয়া হচ্ছে মিলাদের জন্যও।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন কারবার বন্ধ করতে সমাজসেবী আবদুল মান্নান আকন্দ চলতি বছরের ৩রা ফেব্রুয়ারি জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করেন।
তার আইনজীবী মোশারফ হোসেন মনির জানান, জনস্বার্থে দায়ের করা ওই রিটের প্রেক্ষিতে গত ২ জুলাই বিচারপতি জে.বি.এম হাসান এবং বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, জেলার সব স্কুল-কলেজকে সরকারি নীতিমালার বাইরে নেয়া বাড়তি সেসন ফি ফিরিয়ে দিতে হবে। হাইকোর্টের এ আদেশ বগুড়ার অন্যান্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য হবে।
এছাড়া আদেশে হাইকোর্ট বগুড়ার জেলা প্রশাসককে তদন্ত পূর্বক পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে সেশন ফি হিসেবে বিধিমালার বাইরে নেয়া অতিরিক্ত টাকা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়।
কিন্তু চলতি শিক্ষাবছর শেষ হলেও এ পর্যন্ত কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেয়নি। উল্টো ২০২০ সালের জন্য নতুন করে বর্ধিত ফি আদায় করা হচ্ছে।
রিটকারী আবদুল মান্নান আকন্দ বলেন, বগুড়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেশন ফির নামে রীতিমতো ডাকাতি চলছে। এরমধ্যে ৬টি নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্টভাবে আইনের তোয়াক্কা না করেই ইচ্ছেমতো ফি আদায় করছে।
তিনি আরও বলেন, বিবেকের তাড়না থেকেই আমি হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আদালতের নিদের্শনা না মানে তাহলে আমি আবারও আইনের আশ্রয় নেব।
এছাড়া বর্ধিত ফি আদায়ের প্রতিবাদ ও জনসচেতনতা বাড়াতে আগামী ২৮ ডিসেম্বর সাতমাথা গোলচত্বরে অভিভাবক সমাবেশ, আগামী ২৯ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক ও শিক্ষা অফিসার বরাবর স্মারকলিপি দেয়া হবে।
এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ জানান, আদালতের নির্দেশ অনুসারে একটি তদন্ত কমিটি করে তার রিপোর্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। এখন আদালত এ ব্যাপারে পরবর্তী নির্দেশনা দিলে অভিযুক্ত স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
লিমন বাসার/এমএমজেড/পিআর