দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে চলমান দূষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে আগামী প্রজন্ম প্লাস্টিক ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। তাই দেশের পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের আগে সচেতন হতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।
সোমবার সকালে কক্সবাজারের রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড মিলনায়তনে সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত কোস্টাল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইকো ট্যুরিজম শীর্ষক কর্মশালায় পর্যটন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা এসব কথা বলেন। সমুদ্রবিষয়ক পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ আওয়ার সি এ কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালার মিডিয়া পার্টনার দেশের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কম।
কর্মশালায় সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকাগুলোতে পলিথিন, প্লাস্টিকের মোড়কজাত পণ্য এবং ধূমপান পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেভ আওয়ার সি সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল গাজী আনোয়ারুল হকের পরিচালনায় কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (প্ল্যানিং) সোলায়মান হায়দার বলেন, পরিবেশগতভাবে সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। পরিবেশ রক্ষায় কেউ নিজের দায়িত্ব পালন করে না। হোটেল মালিকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে করে না। এসব এলাকায় দোকানদাররা পরিবেশ নষ্টে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। ব্যবসা করবে অথচ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করবে না এটা কীভাবে হয়? এমনকি পর্যটকদের আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে পর্যটকরা সচেতন না থাকায় পর্যটনকেন্দ্রগুলো চরমভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বলে অভিমত প্রকাশ করেন তিনি।
সোলায়মান হায়দার বলেন, টেকনাফ থেকে জাহাজ যখন সেন্টমার্টিনের দিকে যাচ্ছে, তখন পাখিকে চিপস খাওয়ানোর নামে প্যাকেটটা নদীতে ফেলে দেয়। এমনকি সেন্টমার্টিনের বিচে পর্যটকরা গিয়ে সাইকেল বা মোটরসাইকেল নিয়ে নামে। এভাবে বিচটা নষ্ট করে দিচ্ছে। হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেই। রাতেরবেলা আলো জ্বালিয়ে রাখে। সেটা এ দ্বীপকে ঘিরে বেঁচে থাকা জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো এখনই বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, হোটেল মালিকরা ব্যবসামুখী হয়ে গেছেন, পরিবেশবান্ধব হতে পারেননি এটা হতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে পর্যটন এলাকায় আমাদের সন্তানরা ময়লা ছাড়া আর কিছু দেখতে পাবে না। এমনকি খাবার পানিও পাবে না।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, কেন আমরা জাহাজ থেকে পানিতে বর্জ্য ফেলব? কেন আমরা জাহাজ-হোটেল মালিকরা বর্জ্য পরিষ্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করব না? এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে পারে না। যদি এভাবে চলে তাহলে এর ভয়াবহতা অনেক বড়। এভাবে চলতে থাকলে সেন্টমার্টিনে আর মাছ পাওয়া যাবে না। এমনকি পানিও থাকবে না, ময়লা-আবর্জনা ছাড়া। এতে কারও ব্যবসাও থাকবে না। এজন্য আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে, শুধু ব্যবসায়ী হলে চলবে না।
সেন্টমার্টিনে ইট দিয়ে কীভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ অধিদফতরের এ পরিচালক বলেন, এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা কোর্টে গিয়ে মামলা করে স্টে অর্ডার নেয়ায় আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে। তবে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি, শিগগিরই এর সমাধান হবে। আমি ব্যবসায়ীদের বলব, কোর্ট থেকে একটা পজিটিভ রায় এলে আপনাদের এসব স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। ফলে আগে থেকে সতর্ক থাকলে ভালো।
বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক এস এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, দেশের পর্যটনশিল্প টিকে আছে প্রকৃতির ভিত্তির ওপর। তাই পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে আগে রক্ষা করতে হবে প্রাণ ও প্রকৃতি। বিশেষ করে সাগরে পর্যটন ও সমুদ্র অর্থনীতিতে এগিয়ে যেতে হলে সমুদ্রের ইকোসিস্টেম ধরে রাখতে হবে। সমুদ্রের প্রাণীদের তাদের পরিবেশে বাঁচতে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিবুল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশে উৎপাদিত যে কোনো ধরনের পণ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা থাকে না। এজন্য আমরা ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ নামে এ সংগঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমাদের প্রধান টার্গেট ছিল প্রতিবন্ধীদের সমুদ্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে কীভাবে কাজে লাগানো যায়। আমরা চিন্তা করেছিলাম প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে তিনজন করে প্রতিবন্ধীকে রেখে দেয়া, যারা বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মেজবাউল আলম বলেন, সমুদ্র এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ পরিস্থিতির জন্য জনসচেতনতা মূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে। এসব স্পটে পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা অনেক সময় এটা গুরুত্ব দেই না। প্রয়োজনে এ বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে স্থান দিতে হবে। গণমাধ্যমকেও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো দরকার। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পত্রিকাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া আমরা সমুদ্র সম্পদের ব্যাপারে পুরোপুরি অবহিত নই।
আইএইচএস/এমএফ/জেআইএম