মতামত

করোনা নিয়ে ‘করো না!’

মো. ইমরান আহম্মেদ

কোনো বিষয় নিয়ে-ই বাড়াবাড়ি ভালো না। বিষয়টি যদি করোনাভাইরাস মোকাবিলার মতো হয়, তাহলে তো আরও আগে না। কিন্তু আমাদের মধ্যে করোনা নিয়ে বাড়াবাড়ি চলছেই। কিন্তু এ অবস্থায় এমন বাড়াবাড়ি এটি শুধু আত্মঘাতীই হবে না বরং জাতির জন্যও দুর্দশার কারণ হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।

বর্তমান সময়ে করোনা খুবই ‘হট টপিক’ হওয়ায় এমন নিউজ খুব বেশি পড়ে। কিন্তু পাঠক আকৃষ্ট করতে গিয়ে খুবই চটকদার শিরোনামে বুমেরাং হতে পারে। ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রলের সময় একটা নিউজের হেডলাইন পড়ে থমকে গেলাম। ‘লকডাউন না মেনে রাস্তায় নামায় দুজনকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ’। বিস্তারিত পড়ে দেখি, খবরটি রুয়ান্ডার। আবার আরেকটি শিরোনাম দেখলাম, ‘করোনায় ১৯ বাংলাদেশি মারা গেছেন’। সেখানেও নিউজ পড়ে দেখি, আসলে সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত ১৯ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন বলে হিসাব পাওয়া গেছে। আবার কয়েকদিন আগে দেখলাম ‘করোনা থেকে বাঁচতে যেভাবে মেকআপ করবেন’ এমন শিরোনামও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু ঢুঁ মারলে এমন আরও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম পাওয়া যাবে।

আমি মেনে নিচ্ছি, সাংবাদিকতার জায়গা থেকে উপরের শিরোনামগুলো ঠিক আছে। কিন্তু দেশের মানুষ যেহেতু এখন করোনা আতঙ্কের মধ্যে আছে, এক্ষেত্রে এমন শিরোনাম মানুষকে মিসগাইড করতে পারে। আমাদের একটা বড় সমস্যা হলো অনেকেই নিউজ না পড়ে কেবল শিরোনাম পড়ে নিউজ শেয়ার দেন কিংবা মন্তব্য করেন। তাই এমন পরিস্থিতিতে করোনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিউজ করার সময় শিরোনামে ওই দেশের নামটা জুড়ে দিলে ভালো হয়। এতে মানুষ বিভ্রান্ত কম হবেন।

দেশে ওয়াজের নামে এখন যা হচ্ছে, সেটিকে কতটা ওয়াজ বলা যাবে, আর কতটা গিবত কিংবা কাদা ছোঁড়াছুড়ি, তা শ্রোতা এবং দর্শকরাই ভালো বলতে পারবেন। একজন বক্তা দেখলাম, করোনা তার মাহফিলে থাকা শ্রোতাদের নিকট আসবে না বলে গ্যারান্টি দিচ্ছেন। সৌদি আরবে করোনার বিস্তার ছড়িয়ে পড়ায় মক্কা-মদিনাসহ বেশকিছু মসজিদে জুমার নামাজ স্থগিত করা হয়েছে। অনেক দেশই পরিস্থিতির বিবেচনায় ধর্মীয় প্রার্থনা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশেরও কয়েকটি জায়গায় এটা করতে হয়েছে।

কিন্তু এক বক্তাকে দেখলাম, তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশে বলছেন, মক্কায় কী হয়েছে, মদিনায় কী হয়েছে, তা দেখার সময় নেই। পরিস্থিতি যা-ই হোক তারা মসজিদে যাবেনই। আরেক বক্তা আবার সদর্পে ঘোষণা দিচ্ছেন, ইসলামে ‘ছোঁয়াচে’ বলতে কোনো শব্দ নেই। কেউ আবার এটাকে বিধর্মীদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব হিসেবে বর্ণনা করছেন। আরেক বক্তা তো স্বপ্ন বর্ণনাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে করোনাভাইরাসের সাথে কথা বলার ঘটনা ব্যক্ত করছেন।

কিন্তু আমার স্বল্পজ্ঞানে এটুকু বুঝি, করোনার এখনো যেহেতু কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি, কাজেই এখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাই ভালো। এদেশের মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে বক্তাদের কথা মেনে চলেন। তাদের শ্রোতা কিংবা মুরিদদের ওপর অনেক প্রভাবও রয়েছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে করোনার ওইসব বক্তার কথায় মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, আমাদের বক্তাদের বড় একটা অংশ বাস্তবতাকে মেনেই মানুষকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন।

আমাদের দেশের যেসব নাগরিক প্রবাসে থাকেন, তাদের বড় একটা অংশকে জীবিকার প্রয়োজনে বিদেশে যেতে হয়েছে। তাদের সহসাই কিন্তু এদেশে আসার কথা নয়। কেবল ওইসব উন্নত দেশের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে কিংবা আঁচ করতে পেরেই পয়সা খরচ করে দেশে চলে এসেছেন। কিন্তু বিদেশের নিয়ম মেনে চললেও দেশে এসে আমাদের সম্মানিত প্রবাসীদের বড় একটা অংশ নানা বিপত্তি ঘটাচ্ছেন। অনেকের ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা থাকলেও তা করেননি। কেউ চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছেন। কেউ বিয়ে করেছেন। কেউ ঘুরতে বেরিয়েছেন।

খবরে দেখলাম, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক ব্যক্তি আবার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। কিশোরগঞ্জের এক ইতালি প্রবাসী তো আরও এককাঠি উপরে। পুলিশ তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলায় উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। অনেকেই আবার পাসপোর্টে দেয়া ঠিকানায় না থেকে কাউকে অবহিত না করেই অন্যত্র থাকছেন। কেউ আবার পালিয়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উঠেছেন।

বিজ্ঞাপন দিয়ে এখন তাদের খুঁজে বের করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশে যে কয়েকজন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই প্রবাসীদের সাথে মিশে হয়েছেন। প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যরাই সবার আগে ভিকটিম হয়েছেন। যে পরিবারের সুখের জন্য দেশ ছেড়ে প্রবাসে বছরের পর বছর পড়ে থাকতে পারি, সেই পরিবারের সুরক্ষার জন্য কেন ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে পারি না। বড়ই অদ্ভুত আচরণ আমাদের।

করোনার মতো মহামারির সম্মুখীন খুব নিকট অতীতে আমাদের পড়তে হয়নি। করোনার চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে আমাদের পড়তে হচ্ছে। এরই মধ্যে পার্সোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে কাদা ছোঁড়াছুড়ি। করোনার মতো এমন পরিস্থিতিতে এমন চর্চা খুবই অমঙ্গলজনক। আসলে প্রতিটি অঙ্গ মিলেই একটি সরকারের পরিপূর্ণ কাঠামো নির্মিত। সময়, চাহিদা, অবস্থা আর প্রেক্ষিত বিবেচনায় কোনো অঙ্গ কোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন সেই অঙ্গকেই বাকি সবার জোগান দিতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সবাই মিলে কাজ না করলে বিপত্তি বাড়বে বৈ কমবে না।

সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এদেশ স্বাধীন হয়েছে। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতেও আমাদের সব নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ জন্য যে যেই অবস্থানে আছি, যে দায়িত্বে আছি, সেখান থেকেই এগিয়ে আসতে হবে। অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তাহলেই এ বিপর্যয়কে আমরা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে পারব।

আসুন, করোনা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে প্রত্যেকে যার যার দায়িত্বটুকু পালন করি। সম্মিলিত প্রয়াসে করোনাভাইরাস হটানোর প্রত্যয় নিয়ে একসাথে গাইব, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’!

লেখক : সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স), বাংলাদেশ পুলিশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা।

এইচআর/বিএ/এমকেএইচ