দেশজুড়ে

দিনাজপুরে সোয়া দুই কোটি লিচু গাছ নিয়ে স্বপ্নে বিভোর চাষিরা

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও পরপর দুইবার পবিত্র রমজান এবং এবার করোনা দুর্যোগের কারণে লিচু রাজ্য হিসেবে পরিচিত ও দেশব্যাপী লিচুর জন্য বিখ্যাত দিনাজপুরের লিচু চাষিদের কপালে ভাজ পড়েছে। উৎপাদিত লিচু বিক্রি করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তারা।

অন্যান্যবার এ সময়ে লিচু বাগান বেচা কেনা সম্পন্ন হলেও এবার অর্ধেক বাগানও বিক্রি হয়নি। অপরদিকে বাগান কেনার নামে চলছে ফড়িয়াদের উৎপাত।

ঈদের ২ দিন আগে বাজারে লিচু আসার কথা থাকলেও দিনাজপুরের লিচু বাজারে পাওয়া যাবে অন্যান্য বছরের তুলনায় ৫ দিন পর।

তবে লিচু চাষি, ব্যবসায়ী এবং পরিবহন সেক্টরে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ঈদের পরে লিচু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে না পারলে আবারও লোকসানে পড়তে হবে লিচু চাষি ও বেপারিদের।

যদিও এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে পড়তে হয়নি লিচু চাষিদের। তাই লিচু চাষিরাও স্বপ্ন দেখছেন রেকর্ড পরিমাণ লিচু উৎপাদনের।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রমতে এবার ৫/৬শ কোটি টাকার লিচু উৎপাদন হবে। তবে বেসরকারি হিসাবে লিচু উৎপাদন হবে এ চারগুনেরও বেশি। যার মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনাজপুরের প্রতিটি বাড়ির বসতভিটায় বা আঙিনার গাছে থোকায় থোকায় লিচু ঝুলছে। বাগানিরা বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে।

সদর উপজেলার মাসিমপুর গ্রামের লিচু চাষি নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর এ সময় তার বাগানের লিচু বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু করোনার কারণে এবার এখনও বিক্রি হয়নি। বিক্রি হবে কিনা তাও তিনি বুঝতে পারছেন না।

বিরল উপজেলার লিচু চাষি মতিউর রহমান জানান, তার বাগান এখনও বিক্রি হয়নি। দাম বলছে গতবারের চেয়ে অর্ধেক। তাই এবার নিজেই বাগানের লিচু ভাঙবেন বলে জানান।

খানসামা উপজেলা লিচু বাগানের মালিক তাজ ফারাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, করোনার আগে কয়েকজন পাইকার লিচু বাগানের দাম বলেছিল। কিন্তু লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো পাইকার লিচু বাগান দেখতেও আসেনি দামও বলেনি।

বোচাগঞ্জ উপজেলার ৫নং চাতইল ইউনিয়নের বনহড়া গ্রামের লিচু বাগানের মালিক শা সুলতান আব্দুর রহমান বলেন, প্রতিবছর আগাম বাগান বিক্রি হয়। এবার এখনও বাগান বিক্রি করতে পারিনি। যদি বাগান বিক্রি করতে না পারি তাহলে লিচু এলাকার মানুষ ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিলি করে দেব।

কাহারোল উপজেলার লিচু বাগানের মালিক যদিন চন্দ্র শীল জানান, তার দুটি বাগানের মধ্যে একটি করোনা শুরু হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু আরেকটি বাগান এখনও বিক্রি হয়নি। কেউ দামও বলছে না।

রাত জেগে বাগান পাহারা দেয়া এক লিচু চাষি মোসাদ্দেক হোসেন জানালেন আশার কথা। লিচুর ফুল আসা শুরু হওয়া থেকে বাগানের পরিচর্যা শুরু হয়েছে। নিয়মিত স্প্রে ও সেচ দেয়া হচ্ছে। দেরিতে হলেও রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করেছেন। তারা লিচু বাগান ক্রয় করছেন।

এদিকে একটি সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসের কারণে অফিস আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবং লকডাউনের কারণে অনেক মানুষ বেকার বসে আছেন। তাদেরও অনেকে বাগান ক্রয় করছেন। তারা কমদামে বাগান কেনার জন্য হুমকিসহ বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছেন।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. তোহিদুল ইসলাম জানান, চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কোন সময় কোন কীটনাশক, বালাইনাশক ব্যবহার করা উচিত, কোন সময় উচিৎ নয় এসব জানানো হচ্ছে। এবার দিনাজপুরের লিচু চাষিদেরকে ঈদের পরে লিচু ভাঙার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে এবার লিচুর বাজার কালিতলা থেকে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী গোর-এ শহীদ বড় ময়দানে নেয়া হয়েছে।তিনি বলেন, আমরা লিচু উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ থেকে শুরু করে এ সেক্টরের সঙ্গে জড়িত সবার সঙ্গে সম্বনয় করার চেষ্টা করছি।যাতে করে লিচু চাষিরা লোকসানের মধ্যে না পড়েন।

তিনি আরও জানান, চলতি বছর দিনাজপুর জেলায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।যা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। যা ওজনের আকারে ৩০ হাজার মেট্রিক টন। বাজার মূল্য ৫ থেকে ৬শ কোটি টাকারও বেশি হবে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, লিচু চাষে দিনাজপুরে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। ২০১২ সালে দিনাজপুরে ১ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হতো, যা বছর বছর বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সালে এসে ৪ হাজার ১৮০ হেক্টরে দাঁড়ায়। আর ২০২০ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৬ হাজার হেক্টরে।

দিনাজপুরে তথ্য বাতায়ন মতে হেক্টর প্রতি ২৪৭টি লিচুর গাছ রোপন করা হয়। সেই হিসাব অনুয়ায়ী জেলায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টরে ১ কোটি ৬০ লাখ ৫৫০০টি লিচুর গাছে গড়ে ৪ হাজার করে ৬৪২ কোটি ২০ লাখ ( ৬,৪২২,০০০.০০০) লিচু উৎপাদন হবে। আর কৃষি বিভাগ যে দাম বলছেন তাতে করে একটি লিচুর দাম পড়ছে এক টাকারও কম। অথচ ২ টাকার কম কোনো লিচুই বিক্রি হয় না।

প্রতি ১শ লিচুর দাম মাদ্রাজি-২০০ থেকে ৪০০, বোম্বাই-২০০ থেকে ৪০০, বেদানা-৭০০-৮০০ ও চায়না থ্রি-৬০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে।

জেলা তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলায় লিচু উৎপাদনে প্রতি একরে সার, নিড়ানী, সেচ ও বালাই নাশকে খরচ হয় ৩৫ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয় ৩ লাখ টাকা।

দিনাজপুরে মাদ্রাজি ৩০%, বোম্বাই ৩৯%, বেদানা ৫%, চায়না থ্রি ২৫% ও কাঠালী বোম্বাই ১% জমিতে চাষ হয়। উৎপাদিত লিচুর ২০% দিনাজপুর জেলায় ও ৮০% দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে।

দিনাজপুরের লিচুর মধ্যে চায়না থ্রি, বেদেনা, বোম্বাই, মাদ্রাজি ও কাঠালী উল্লেখয্যেগ্য। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে এবার এসব প্রজাতির লিচুর বাম্পার ফলনের আশা করছেন চাষিরা।

এমদাদুল হক মিলন/এমএএস/পিআর