কক্সবাজারে হোটেল কক্ষে ইয়াবা সেবন ও নারী নিয়ে ফূর্তিকালে রমজানুল আলম ওরফে রমজান সওদাগর (৪০) নামে জেলা যুবলীগের এক নেতাকে আটক করেছে সদর থানা পুলিশ।
এসময় তার মালিকানাধীন একটি প্রিমো ব্র্যান্ডের প্রাইভেটকারও জব্দ করা হয়েছে। হোটেল কক্ষের সেবনস্থল, তার প্যান্টের পকেট ও প্রাইভেটকারের বক্সে তল্লাশি করে মিলেছে ৮০ পিস ইয়াবা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভোরে কক্সবাজারের কলাতলী ‘ওয়ার্ল্ড বিচ রিসোর্টে’ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন সদর থানা পুলিশের ওসি (অপারেশন) মো. মাসুম খান।
অভিযানে লক্ষাধিক ইয়াবা উদ্ধারের কথা প্রচার পেলেও মাত্র ৮০ পিস ইয়াবা নিয়ে মামলা হওয়ায় নানা সমালোচনা চলছে। তদবিরের কারণে তাকে রক্ষায় এমনটি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ সচেতন মহলের।
আটক রমজানুল আলম কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড মাইজপাড়া এলাকার মৃত আব্দুল গণির ছেলে। তিনি ঈদগাঁও বাজারের ইজারাদার ও অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটির ‘ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক' এবং জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক সোহেলের ব্যবসায়িক পার্টনার।
তাকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে ওসি অপারেশন মাসুম খান বলেন, কলাতলী ওয়ার্ল্ড বিচ রিসোর্টের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের পাশাপাশি পতিতা নিয়ে ফূর্তি করছে কিছু যুবক এমন সংবাদে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভোরে অভিযান চালায় শহরে মোবাইল ডিউটিতে থাকা পুলিশ দল। অভিযান টের পেয়ে পতিতাসহ কয়েকজন পালিয়ে যায়। অন্যরা পালিয়ে গেলেও ইয়াবা সেবনকালে আটক হন রমজান। রমজানের দেহ তল্লাশি চালিয়ে প্রথমে ৩০ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। পরে তার স্বীকারোক্তি মতে রিসোর্টের নিচে তার গাড়ি থেকে আরও ৫০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়।
তিনি আরও জানান, পুলিশের কাছে তিনি (রমজান) স্বীকার করেছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দীর্ঘদিন কাজ (চাকরি) করার আড়ালে ইয়াবা ট্যাবলেট পাচার ও সেবনে জড়িত রয়েছে। নিয়মিত তার ব্যক্তিগত গাড়িযোগে ইয়াবা পাচার করতো রমজান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষাজীবন শেষ করেই ধারদেনায় একটি মাইক্রোবাস কিনে কোম্পানি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে রমজান। ভাড়া আশানুরূপ না হলেও দিন দিন তার গাড়ির সংখ্যা আশ্চর্যজনক ভাবে বেড়েছে।
একসময় ঈদগাঁও ছেড়ে কক্সবাজারে অবস্থান গাড়ে রমজান। মেসার্স আর এন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কলাতলী বাইপাস এলাকার ‘ওয়ার্ল্ড বিচ রিসোর্ট’-এ অত্যাধুনিক অফিস খোলেন।
সদর যুবলীগের শীর্ষ কয়েক নেতার স্বজনদের সাথে নিয়ে কোটি টাকায় ঈদগাঁও বাজার ইজারা নিয়ে আসছিলেন রমজান। ইতোমধ্যে জেলা যুবলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক সোহেলের সাথে সখ্য গড়েন তিনি। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে তার আর এন এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান হিসেবে সোহেলকে সংযুক্ত করেন সম্প্রতি। এর ফল হিসেবে ছাত্রজীবন থেকে এ পর্যন্ত কোন দিন রাজনীতির ময়দানে না থাকলেও জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটির ‘ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক' হিসেবে নাম গেছে রমজানের।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মূলত ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা জমিয়েছে রমজান। তা বৈধ করতেই কোটি টাকায় ঈদগাঁও বাজার ইজারাসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কমমূল্যে উন্নয়নকাজে টেন্ডারে অংশ নেয়। চলতি বাংলা বছরে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় কোটি টাকায় ঈদগাঁও বাজার ইজারা নিয়েছেন। ইজারায় ঢেলে দেয়া টাকা উঠে না এলেও সেসব ব্যবসার আড়ালে আর এন এন্টারপ্রাইজের সাইনবোর্ডে ইয়াবার লেনদেনই ছিল তার মূল আয়ের উৎস, যা তিনি নিজেই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আটক রমজানের ব্যবসায়িক পার্টনার এবং নিজে আর এন এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান স্বীকার করে জেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক সোহেল বলেন, আমার নেতৃত্বে আমাদের ফার্ম চলতি সালেও ঈদগাঁও বাজার ইজারা নিয়েছি। জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রমজানের নাম দেয়া হয়েছে তবে কমিটি এখনও অনুমোদন হয়নি বলে উল্লেখ করেন সোহেল।
কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের ওসি শাহজাহান কবির বলেন, রমজান একজন ইয়াবা কারবারি। তার সাথে অনেকেই জড়িত। আটকের পর অনেক কিছু তথ্যও পাওয়া গেছে। রমজানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলেই আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, কে কোন দল করে তা বিবেচনার বিষয় নয়। ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের সাথে জড়িত বলে যাদের নাম আসবে, তদন্ত সাপেক্ষে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সায়ীদ আলমগীর/এমএএস/এমকেএইচ