দেশজুড়ে

‘চামড়ার কডা টাকা পাতাম, এবার তাও পালাম না’

‘প্রত্যেকবার কোরবানির চামড়া বিক্রি করে কিছু টাকা পাতাম, এবার পালাম না বাবা’। আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন বেনাপোলের বারোপোতা গ্রামের আল্লাদি বিবি (৮৫)। একইভাবে শার্শা উপজেলার বড়বাড়িয়া গ্রামের ভিখারি সজ্জোত আলী (৯০) বলেন, ‘চামড়ার কডা টাকা পাতাম, এবার তাও পালাম না। কচ্ছে, চামড়া বিক্রি নেই।’

অন্যদিকে মাদরাসা-এতিমখানার কর্তৃপক্ষ বলছে, বছরের তিন থেকে চার মাসের ব্যয়ের অর্থ কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে আসত। এবার চামড়ার দাম কম হওয়ায় সেটা সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোরবানির চামড়ার দাম না থাকায় এতিমখানা ও কওমি মাদরাসাগুলো বিপাকে পড়ার শঙ্কা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতিমখানা, হেফজোখানা ও কওমি মাদরাসার অর্থের বড় একটা জোগান আসে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। যশোরের শার্শা ও বেনাপোলের ভুক্তভোগীরা বলছেন, বরাবরের মতো চামড়া পেলেও এবার দাম কম হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া হেফজোখানার তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা খায়রুল বাসার জানান, তাদের দরিদ্র, অসহায়, এতিম শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে বিনামূল্যে খাবার দেয়া হয়। বছরের তিন থেকে চার মাসের ব্যয়ের অর্থ কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে আসত। এবার চামড়ার দাম কম হওয়ায় সেটা আর সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

শার্শার সামটা মুসলিম এতিমখানার সভাপতি লিয়াকত আলী জানান, চামড়ার দাম কম হওয়ায় এতিমখানার বড় ক্ষতি হবে। চামড়া থেকে আসা অর্থ দরিদ্র, অসহায়, এতিম শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া ও লেখাপড়ায় ব্যয় করা হতো। এবার হয়তো সেটা আর হবে না।

এতিমখানার তত্ত্বাবধায়ক আবুল বাসার জানান, এ ঈদে তারা ২৭৭টি চামড়া পেলেও ক্রেতা না পেয়ে এক আড়তে দিয়ে এসেছেন। বাজারদর অনুযায়ী টাকা দেয়ার আশ্বাস মিলেছে তাদের।

নাভারনের সিরামকাটি ওয়ালুম কওমি হাফিজিয়া মাদরাসাপ্রধান আব্দুল্লাহ আল নোমান জানান, নাভারন কাজিরবেড় ও সিরামকাটি গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের কোরবানির চামড়া তারা পান। এবার গরুর চামড়া পেয়েছি ১১২টি আর খাসির ২০৫টি। বেচাবিক্রির চেষ্টা করছি কিন্তু এখনও বেচতে পারিনি।

বেনাপোল বাজার এতিমখানার প্রধান মাওলানা আবুল হোসেন বলেন, ‘এটা হয়তো খুব বেশি বড় নয় কিন্তু তারপরও চামড়া বিক্রির খাত থেকে টাকা আসত। এবার কোরবানি কম হওয়ায় চামড়া সংগ্রহ কমেছে। তারপরও সংগ্রহ যা হয়েছে তার দাম নেই বললেই চলে।’

বেনাপোলের বালুন্ডা হাইস্কুলের শিক্ষক মিজানুর রহমান কোরবানির ছাগলের চামড়ার ক্রেতা না পেয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। একই এলাকার মাংস বিক্রেতা রেজাউল ইসলাম প্রতি কোরবানি ঈদে গ্রাম থেকে চামড়া কেনেন। এবারও কিনেছেন, তবে সতর্কতার সঙ্গে। এবার ৮৩টি গরুসহ মোট ১৬০টি চামড়া কেনার পর রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘গরুর চামড়া প্রতিটি ৭০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম দিছি। ছাগলের চামড়া কিনেছি ১৫-২০ টাকায়। কিছু চামড়া লোক দেছে বিক্রি করতি পারলি তারা টাকা পাবে, এই শর্তে। আড়তদাররা ৩০-৪০ টাকা দাম বলছে। এখন দেখি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।’

উপজেলার নাভারন বাজারে চামড়া বেচাকেনা করেন মির্জাপুর গ্রামের শফিউর রহমান এবং দক্ষিণ বুরুজবাগান গ্রামের চঞ্চল হোসেন। তারা জানান, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চামড়া নিচ্ছে না শুনে তারা চামড়া কেনার সাহস হারিয়েছেন। বড় গরুর চামড়া এক-দেড়শ টাকা থেকে ২০০ টাকায় কিনেছেন। ছাগলের চামড়া ২০ টাকার ওপরে যাননি। অনেকে ছাগলের চামড়া ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন বলেও জানান তারা।

মো. জামাল হোসেন/এমএআর/পিআর