বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেসকোর্স ময়দানে হাজির হয়ে শুনতে পারেননি বাচ্চু মৃধা। পরে সেই ভাষণ শুনেছেন রেকর্ডে। শোনার পর থেকে সেই ভাষণ গেঁথে আছে তার হৃদয়ে। ভাষণের রেকর্ডটি প্রথম সংগ্রহের পর থেকে এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সব রেকর্ডসহ তার সংগ্রহে আছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার রেকর্ড। গানপাগল বাচ্চু মৃধা মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার টরকি গ্রামের মৃত সিকিম আলি মৃধার ছেলে।
মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার মুন্সিরহাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি জরাজীর্ণ একটি দোকনে বসে কলের গান বাজাচ্ছেন বাচ্চু মৃধা। তার মিঠাইয়ের দোকানে অসংখ্য মৌমাছির আনাগোনা। দোকানের মেঝের উপর বসে গুড় (মিঠাই) বিক্রি করছেন তিনি। তার সামনেই রয়েছে একটি পুরোনো রেকর্ড বক্স। বক্সটি ভেঙে যাওয়ার পর সমপরিমাণের বাটখাড়া ঢুকিয়ে সংস্কার করে কোনরকম বসিয়ে রাখা হয়েছে রেকর্ড বক্সটি।
যদিও তার মিঠাইয়ের দোকানে তেমন ক্রেতা নেই। তবে গান শোনার জন্য মানুষের কমতি নেই। একটির পর একটি রেকর্ড খুলছেন আর নতুন আরেকটি ভরছেন। একের পর এক গান বেজে যাচ্ছে তার রেকর্ডে- ‘তোমার নেতা শেখ মুজিব, আমার নেতা শেখ মুজিব’, ‘জয় বাংলা জয় বাংলা বইলারে মাঝি বাদাম দাও তুলিয়া’, ‘এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা’, ‘আমি কত দিন কত রাত ভেবেছি বলবো তোমায় একটি পুরানো কথা নতুন করিয়া’।
মাঝে মাঝে কলের রেকর্ড বক্সটির হাতলকে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। মাঝেমধ্যে দু’একজন গুড় (মিঠাই) কিনতে এলে ডিজিটাল মেশিনে ওজন করে গুড় (মিঠাই) বিক্রি করছেন। তবে গুড় বিক্রির চেয়ে গান শুনিয়ে যেন বেশি তৃপ্তি পান।
এ বিষয়ে বাচ্চু মৃধা জানান, তার বয়স বর্তমানে ৭০ বছর। ১০ বছর বয়স থেকে বাবার সাথে মিঠাই বিক্রি শুরু করেন তিনি। প্রতিদিন ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকার মিঠাই বিক্রি করেন। যা আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমানের ৫ সদস্যের পরিবারটির দিনাতিপাত। প্রায় ৪০ বছর আগে ৫শ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন কলের গানের বক্সটি।
এরপর অনেক কলের গানের বক্স কিনলেও সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। এটিকে রেখে দিয়েছেন সযত্নে। ৪০ বছরে বহু কলের গান শুনেছেন তিনি। যখনই কোনো গান ভালো লেগেছে; তখনই ছুঁটে গেছেন সেই রেকর্ড সংগ্রহ করতে। টাকা যতই লেগেছে কিনে এনেছেন সেই রেকর্ড।
তিনি আরও জানান, এখন তার দখলে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার রের্কড। এসব রেকর্ড অতিযত্ন করে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের কলের গানের রেকর্ড আছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও গান বাজানোর অপরাধে অনেকবার দোকান বন্ধ করে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে। থাকতে হয়েছে আত্মগোপনে। শুনতে হয়েছে নানা কথা।
তার কথা একটিই, ‘আমার নেতা বঙ্গবন্ধু। আমি যতদিন বাচঁবো, তার ভাষণ তার গান বাজাবোই। বর্তমানে কলের গানের যে রেকর্ড, সেটা আর বাজারে পাওয়া যায় না। তাই পুরোনোগুলোই বারবার বাজিয়ে শুনি। বক্সটি নষ্ট হলে নিজেই ঠিক করে নেই। কারণ কলের গানের বক্স ঠিক করার মতো মিস্ত্রি বর্তমানে আর পাওয়া যায় না।’
পাশের দোকানি রুবেল হোসেন বলেন, ‘বাচ্চু কাকা সকাল থেকে শুরু করে নামাজের সময় ছাড়া দোকানে যে সময় থাকে; প্রায় সময়ই কলের গান বাজান। আমরা সব সময় তার বাজানো গান শুনি। তার বাজানো পুরোনো দিনের গান এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে তার দোকানের সামনে প্রায়ই মানুষের ভিড় জমে যায়।’
এসইউ/এএ/এমকেএইচ