দেশজুড়ে

প্রশাসনের অনুমোদনে চলছে ‘নিষিদ্ধ’ শামুক-ঝিনুক বিকিকিনি

পরিবেশ আইনে শামুক-ঝিনুক আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু এই নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুক প্রকাশ্যে বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রধান হিসেবে জেলা প্রশাসকের অনুমতিপত্র নিয়ে সাগর তীরে গড়ে ওঠা ঝিনুক মার্কেটে অর্ধসহস্রাধিক দোকানে রমরমা বিকিকিনি হচ্ছে নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুকের অলঙ্কার ও পণ্য সামগ্রী।

যদিও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর তফসিল-২ এর ৬ ধারায় প্রবালের ৩২টি ও শামুক-ঝিনুকের ১৩৭টি প্রজাতিকে শিকার ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এই আইনকে আমলে নিচ্ছে না প্রশাসন কিংবা ব্যবসায়ী কেউই।

অথচ সমুদ্র ও উপকূল রক্ষা করতে চাইলে এসব রক্ষায় আমাদের সবার একসঙ্গে এগিয়ে আসা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সমুদ্রবিজ্ঞানীরা। নয়তো সমুদ্র সৈকত নিজস্বতা হারাতে পারে বলেও মন্তব্য তাদের।

কিন্তু খোদ প্রশাসনই এ অবৈধ কর্মকাণ্ডকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বৈধতা দিয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন ও প্রটোকল শাখার পক্ষ থেকে অর্ধসহস্রাধিক দোকানিকে এসব শামুক-ঝিনুক, শৈবাল ও প্রবাল বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে এসব ঝিনুক বিক্রির দোকানের অনুমোদন দিয়ে আসছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক।

জানা যায়, কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে ২৬৪টি এবং লাবণী পয়েন্টে ২০২টি ঝিনুকের দোকানের ‘অনুমোদন কার্ড’ ইস্যু করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন ও প্রটোকল শাখা। এই পরিসংখ্যানের বাইরে আরও শতাধিক দোকান রয়েছে যেখানে অনুমোদন কার্ড ছাড়াই বিক্রি করা হচ্ছে শামুক-ঝিনুক।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাগরে সারা বছরই শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়। তবে শীত মৌসুমে এবং সাগর উত্তাল থাকলে বড় ও মূল্যবান শামুক-ঝিনুক বেশি মেলে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতে শামুক-ঝিনুক সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে কয়েকগুণ। তাই এ সময়ে আহরণ এবং বিক্রিও হয় বেশি।

পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শামুক-ঝিনুক বিকিকিনিতে জেলা প্রশাসনের আইন বহির্ভূত অনুমোদন বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদফতর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব থাকায় উদ্বেগ জানিয়েছে কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

যদিও নির্বিচারে শামুক-ঝিনুক আহরণসহ নানা কারণে কক্সবাজার, সোনাদিয়া ও সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত বিপর্যয় হওয়ায় দেড় যুগ আগে এলাকাগুলোকে পরিবেশ আইনে ‘প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)’ ঘোষণা করে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো মতে, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করেই হাত গুটিয়ে বসে আছে পরিবেশ অধিদফতর। শামুক-ঝিনুকের সামগ্রী তৈরি এবং বিক্রির জন্য নির্বিচারে আহরণের কারণে সৈকত থেকে শামুক-ঝিনুক প্রায় ৮০ শতাংশ আবাসস্থল হারিয়েছে।

পরিবেশবাদী সেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্যা ন্যাচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আ ন ম মোয়াজ্জেম হোসেন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে শতশত দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে শামুক-ঝিনুক, শৈবাল ও প্রবাল। বেশিরভাগ দোকানি গভীর সমুদ্র ও মাটির নিচ থেকে জীবন্ত অবস্থায় এসব তুলে এনে বিক্রি করছে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর এসব দেখার পরও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগিয়ে না এসে উল্টো এসব বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। সৈকতে শৈবাল, প্রবাল ও শামুক-ঝিনুক হত্যা করে বিক্রির লাইসেন্স দেয়া কি আইন লঙ্ঘন নয়?’

অবিলম্বে এসব ঝিনুক-শামুকের দোকান বন্ধ ও লাইসেন্স বাতিল করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কাউসার আহমেদ বলেন, ‘যেখানে পরিবেশ আইনে শামুক-ঝিনুক ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ সেখানে জেলা প্রশাসন কোন যুক্তিতে এসব বিক্রির জন্য দোকানের অনুমোদন দিলো তা বোধগম্য নয়। আমরা শুধু এসব প্রাণী ধরাকেই অপরাধ মনে করি। কিন্তু এসব যে বিক্রির উদ্দেশ্যে ধরা হচ্ছে এবং প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে সেটা কারও নজরে আসছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সমুদ্র ও উপকূল রক্ষা করতে চাইলে এসব রক্ষায় আমাদের সবার একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। নয়তো বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত অচিরেই হারিয়ে যাবে।’

এদিকে, কক্সবাজার ঝিনুক মার্কেটের দোকানি আবদুর রহিম বলেন, ‘বিক্রি করা বেশিরভাগ শামুক-ঝিনুকই বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা হয় বলে উল্লেখ করেন পাইকাররা। বর্তমানে জীবন্ত শামুক-ঝিনুক কম পাওয়া গেলেও সমুদ্র থেকে যে এসব ধরা হচ্ছে এবং সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে তা অস্বীকার করা যাবে না।’ তবে প্রশাসনের দেয়া অনুমতি বা লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার জেলার উপ-পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘বিক্রি নিষিদ্ধ এসব বণ্যপ্রাণী বিক্রিতে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন দেয়ার কথা নয়। কোন যুক্তিতে বা কিসের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন এ অনুমোদন দিয়েছে সেটা বোধে আসছে না। তবে কেন অনুমতি দিয়েছে সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে।’

তার মতে, যদি দোকানিরা এসব শামুক-ঝিনুক ধরে এনে বিক্রি করে তাহলে অবশ্যই তারা আইনের আওতায় আসবে। এ ধরনের ঘটনার তথ্য থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের জানানোর জন্য কক্সবাজারবাসীর প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।

বিষয়টি সম্পর্কে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফোরকান আহমেদ বলেন, ‘শুধু ঝিনুক-শামুকের দোকান নয়, কক্সবাজার সৈকতের সব দোকানই অবৈধ। জেলা প্রশাসন কোন আইনে এসব দোকানের বৈধতার লাইসেন্স দিয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘গরিবের নাম দিয়ে সৈকতে কারা দোকান বরাদ্দ পেয়েছে, সে খবর অজানা নয়। এখন যদি আমি হুট করে তাদের এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে যাই, তাহলে সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের মাঝে ধাক্কাধাক্কি হতে পারে। তবে আমি এসব স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য ধীরে ধীরে এগুচ্ছি। সৈকতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করবোই।’

এদিকে শামুক-ঝিনুক বিক্রির অনুমোদন দেয়ার কথা স্বীকার করে কক্সবাজার পর্যটন ও প্রটোকল শাখার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সৈকতে পাঁচ শতাধিক ঝিনুক-শামুকের দোকানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব দোকান থেকে বাৎসরিক ফি আদায় করা হয়। লাবণী পয়েন্ট ও কলাতলীর দোকানগুলো থেকে আট হাজার আর সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করা হয়।’

পরিবেশ আইনে নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুক বিক্রির বৈধতা কক্সবাজার জেলা প্রশাসন দিতে পারে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর ও আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে বিভিন্ন ব্যক্তির আবদার এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল দোকানিদের আবেদনের ভিত্তিতেই এসব দোকানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।’

এদিকে, নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুক বিক্রির দোকান পরিচালনার অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে জানতে সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হয়। কিন্তু রিং হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বক্তব্য জানার বিষয়টি উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও জেলা প্রশাসক সাড়া না দেয়ায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

সায়ীদ আলমগীর/এমআরআর/জেআইএম