দেশজুড়ে

গাছকাটা ছেড়ে মাছ ধরে মুন্ডারা

নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্ডা সম্প্রদায় এখন অস্তিত্ব সংকটে। বাপ দাদার বাদাকাটা (বনের গাছকাটা) পেশা হারিয়ে এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন এই সম্প্রদায়ের প্রায় তিন হাজার মানুষ। ফলে ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।

আদিবাসী মুন্ডাদের বসবাস সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলায়। গত ২৫০ বছর ধরে বসবাস করছেন তারা। এলাকায় তারা সুন্দরবনের আদিবাসী ‘মুন্ডা’ সম্প্রদায় নামেই পরিচিত। আদি নিবাস ভারতের ঝাড়খণ্ড ও রাচি এলাকায়। এদেশে আসা মুন্ডাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি।

সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (সামস) দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে শ্যামনগরে মুন্ডাদের ৪২০টি পরিবারের জনসংখ্যা ২ হাজার ৭৪০। এসব পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাবকে পুঁজি করে ভূমিদস্যুরা তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে। বর্তমানে চার শতাধিক পরিবারের মধ্যে তিনজন গ্রাম পুলিশ এবং ১৩ জন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। অন্য সদস্যরা দিন মজুরের কাজ করেন।

প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করতে পারে এই সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসকরা সমতল ভূমির বন জঙ্গল কেটে কৃষি উপযোগী করাসহ পরিচ্ছন্ন হাট-বাজার ও নগর গড়ে তোলার কাজে তাদের নিয়ে আসে এদেশে। এক সময় তাদের সুন্দরবনের গাছ কেটে জন বসতি গড়ার কাজে লাগানো হয়। সময়ের আবর্তে মুন্ডা সম্প্রদায়ের পেশার সঙ্গে কাজের ধরনও বদলে যায়। এরপর থেকেই তারা এ অঞ্চলের বিভিন্ন নদীর পাশে বসতি গড়ে তোলেন।

বর্তমানে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর, কচুখালী এলাকায় নদীর তীরে সরকারি খাস জমিতে বাস করে আদিবাসী মুন্ডারা। আগে তাদের প্রধান জীবিকা ছিল সুন্দরবনের গাছ কাটা, নদীতে মাছ শিকার ও কৃষিকাজ। বর্তমানে তাদের অনেকেই আদি পেশা ছেড়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ গ্রামের বাহামনি মুন্ডা জানান, পূর্ব পুরুষদের পেশা ছিল জঙ্গলের গাছ, গোলপাতা ও গরান কাঠ কাটা। বর্তমানে গাছকাটা বন্ধ করেছে সরকার। ফলে অনেকেই আদি পেশা ছেড়ে কৃষিকাজ ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কেউ কেউ অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।

উপজেলার কালিঞ্চি গ্রামের বৃদ্ধ কাহার মুন্ডা বলেন, বাদাকাটা জমিতে তিন পুরুষের বাস। আগে পূর্ব পুরুষের পেশায় ছিলাম। বনের গাছ কেটে বিক্রি করতাম। এরপর মহাজনরা আমাদের বনে গাছ, গোলপাতা কাটতে নিয়ে যেত। এখন বনে যেতে দেয় না। তাই নিজেরা জাল বুনে সুন্দরবনের নদী খালে মাছ, কাঁকড়া ধরছি।সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (সামস) নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেন, বাঙালিদের সঙ্গে লেখাপড়ার কারণে নিজেদের ভাষা ভুলতে বসেছে বর্তমান প্রজন্ম। প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা না থাকায় মুন্ডারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চাও করতে পারছে না।

মুন্ডাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্যারামমুরা নাট্য গোষ্ঠীর পরিচালক গোপাল চন্দ্র মুন্ডা বলেন, ‘মুন্ডারী’ ধর্মের অনুসারী মুন্ডাদের প্রধান উৎসব ‘করম পূজা’। বাংলা ভাদ্র মাসের একাদশি তিথিতে এই উৎসব হয়। মুন্ডাদের নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক ‘বন্দনা নৃত্য’।

স্থানীয় জেলা পরিষদ সদস্য ডালিম কুমার ঘরামি বলেন, বঞ্চিত এই সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য জেলা পরিষদ থেকে কিছু সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। তবে তা অপর্যাপ্ত। বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলে জানিয়েছি। স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।

আহসানুর রহমান রাজীব/এসজে/এএসএম