জাতীয়

কথা শেষ না হতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন বঙ্গবন্ধু

নিপীড়িত বাঙালির জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ১৯৪৭ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেন, তাতে বৃহত্তর পাবনার জনগণকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। সেজন্য এখানকার রাজনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখতেন। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, আমজাদ হোসেন, আবদুর রব মিয়া, অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন খন্দকার, আবু তালেবসহ এ অঞ্চলের অনেক রাজনীতিকই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাদের কেউই আজ জীবিত নেই।

বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পাওয়া জীবিতদের মধ্যে অন্যতম একজন আমিরুল ইসলাম রাঙা। পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার বেরুয়ান গ্রামে ১৯৫৩ সালে জন্ম তার। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৬৪ সালের পাবনার ঐতিহ্যবাহী আরএম একাডেমিতে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালের ছাত্রলীগের স্কুল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭০ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় স্কুলছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পাবনা জেলা যুগ্ম-আহ্বায়ক হন। শহীদ আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়, আটঘরিয়া কলেজ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে পড়াশোনা করা রাঙা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাবনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইছামতির সম্পাদক হন। ১৯৭৩ সালে জাসদ গঠিত হওয়ার পর সংগঠক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৭৩ সালের ২১ মার্চ রক্ষীবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে আড়াই বছরের বেশি সময় জেলে ছিলেন। তিনি আটঘরিয়া প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদের সামনে দেবোত্তর কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তিনি।

পাবনায় জনতার মাঝে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

২০০৬ সাল থেকে পাবনা জেলা জাসদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আমিরুল ইসলাম রাঙা। এছাড়া সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ পাবনার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি দেখা এ মানুষটির সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। বললেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এ বাঙালিকে দেখার ও কথা বলার অনুভূতির কথা।

জাগো নিউজ: কতবার বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন?

আমিরুল ইসলাম রাঙা: ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব কাছে থেকে পাঁচবার দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। এরমধ্যে দুইবার কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। একবার আমার লেখা কবিতা শুনিয়েছিলাম। আরেকবার তার গলায় মাল্যদান করি এবং আমার নিজের লেখা মানপত্র প্রদান করি। দু’বার তার জনসভা শোনার সুযোগ হয়। আরেকবার ঢাকা স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম।

জাগো নিউজ: প্রথমবার বঙ্গবন্ধুকে দেখার কথা বলুন...

আমিরুল ইসলাম রাঙা: বঙ্গবন্ধুকে জীবনে প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালের ৭ এপ্রিল। আমি তখন রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। বঙ্গবন্ধুর পাবনায় আগমন উপলক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চলছিল। ঠিক সেই সময়ে রাধানগর মক্তব এলাকায় পাড়ার মুরুব্বি, বড় ভাই এবং সহপাঠীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পাবনায় আগমন নিয়ে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখনই মূলত রাজনীতি নিয়ে একটু ধারণা হয়। প্রথম ধারণা হয় ছাত্রদের জন্য ছাত্রলীগ আর বড়দের জন্য আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা হলেন শেখ মুজিব। আর সেই শেখ মুজিব আসবেন পাবনায়। কৌতূহলটা তখন চরম পর্যায়ে।

বেশ কয়েকদিনের প্রচার-প্রচারণা শেষে ঘটনাবহুল ৭ এপ্রিল। পাবনা পৌর সদরের মক্তব স্কুলের মোড় থেকে পাড়ার মুরুব্বি রমজান আলী, কিয়ামুদ্দিন প্রাং, এরশাদ প্রাং, গোরা মান্নান, মোহররম প্রমুখদের নেতৃত্বে শতাধিক জনতার মিছিল পাবনা টাউন হল অভিমুখে রওনা হয়। আমার মতো ছোট ছেলেরা ছিল মিছিলের সম্মুখভাগে। স্লোগান দিতে দিতে পাবনা টাউন হলে পৌঁছালাম।

মিটিং শুরুর বেশ আগে আমরা উপস্থিত হয়েছি। আমার মতো কিশোর, তরুণ এবং কিছু সংখ্যক নারীর মঞ্চের খুব কাছে বসার সুযোগ হয়। সেখান থেকে নেতাদের বক্তৃতা শোনা এবং তাদের দেখার জন্য খুব ভালো জায়গা ছিল। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বক্তৃতা করছেন। এক পর্যায়ে টাউন হলের মাঠ ভরে রাস্তায় মানুষ জমায়েত হয়েছে।

বিকেলে জনসভা শুরু হলো। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেনের সভাপতিত্ব এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়া পরিচালনা করছিলেন। সেদিন পাবনার অনেক নেতাকে প্রথম দেখি।

পাবনা টাউন হল

একপর্যায়ে শেখ মুজিবসহ কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠে এলেন। একে একে সফরসঙ্গীরা বক্তৃতা দিলেন। শেষে বক্তব্য দেয়ার জন্য মাইকের সামনে এলেন শেখ মুজিবুর রহমান। খুব কাছ থেকে তাকে দেখছিলাম আর তার দরাজ কণ্ঠের ভাষণ শুনছিলাম। যেমন সুন্দর তার চেহারা, তেমন সুন্দর তার ভাষণ। সেদিনের অসাধারণ মুহূর্তটি এখনও মানসপটে জেগে আছে। বলা যায় সেদিন থেকে শেখ মুজিব আমার অন্তরে গেঁথে যান।

সেই থেকে আমার রাজনীতি শুরু হলো। ৬৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন, ভুট্টোবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, ৬৮/৬৯ এর গণআন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আরএম একাডেমি স্কুল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি হলাম।

১৯৬৯/৭০ সালে দুইবার ঢাকায় ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদান করার সুযোগ হলো। ১৯৬৯ সালে পাবনার স্কুলছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক হলাম। ১৯৭০ সালে জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি বই বাতিলের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখলাম। সেই আন্দোলনের সময় আট পৃষ্ঠার কবিতা লিখে আলোচিত হলাম। ইতোমধ্যে পাবনার রাজনৈতিক নেতা এবং ছাত্র নেতাদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত হলাম।

দ্বিতীয়বার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখলাম ১৯৭০ সালে ৮ মার্চ। বঙ্গবন্ধু কুষ্টিয়া থেকে সড়ক পথে পাবনা আসেন। পাবনার পাকশী, দাশুড়িয়া, টেবুনিয়া, এডওয়ার্ড কলেজ গেটে পথসভা করেন। বিকেলে পাবনা স্টেডিয়ামে (তৎকালীন জিন্নাহ পার্ক) বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।

সেদিন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়ার বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখা এবং তাকে আমার লেখা আট পৃষ্ঠার কবিতাখানি পাঠ করে একটি কবিতা তাকে দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু পুঁথিপাঠের সুরে কবিতা পড়া এবং কবিতার ভাষা শুনে অভিভূত হয়েছিলেন। তিনি আমাকে তাৎক্ষণিক জড়িয়ে ধরে উৎসাহিত করেছিলেন।

তৃতীয়বার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখলাম ১৯৭০ সালের ২৫ ডিসেম্বর। পাবনায় নব-নির্বাচিত এমপি আহমেদ রফিক ১৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে জয়লাভের পাঁচদিন পর ২২ ডিসেম্বর শহরের রাঘবপুর মহল্লায় নিজ বাড়ির সামনে নকশালদের হাতে নিহত হলে বঙ্গবন্ধু ২৫ ডিসেম্বর পাবনায় আসেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু ঢাকা থেকে সড়কপথে পাবনায় এসে শহীদ আহমেদ রফিকের বাসভবনে যান। সেখানে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন। তারপর আরিফপুর কবরস্থানে গিয়ে নিহত আহমেদ রফিকের কবর জিয়ারত করেন।

এরপর পাবনা পুলিশলাইন মাঠে শহীদ আহমেদ রফিককে হত্যার প্রতিবাদে বিশাল সমাবেশে বক্তৃতা করেন। সেদিনও বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখি এবং তার বক্তব্য শুনি।

১৯৭২ সালের ১০ মে হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধু পাবনা স্টেডিয়ামে পৌঁছালে তাকে মাল্যদান করেন আমিরুল ইসলাম রাঙা

এরপর দেখলাম ১৯৭২ সালে ৩১ জানুয়ারি। তখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে আমি। ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে দেখলাম তাকে। আটঘরিয়া থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আনোয়ার হোসেন রেনুর নেতৃত্বে ৩০ জানুয়ারি আমরা পাবনা জেলা স্কুল থেকে রওনা দিয়ে ঈশ্বরদী রেল জংশনে যাই। সেখান থেকে ট্রেনে ঢাকা যাই। বলা যায় গোটা ট্রেনে গোলাবারুদ আর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মুক্তিযোদ্ধাদের দল। পরদিন সকালে ঢাকা পৌঁছে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামে যাই। সেখানে সারাদেশ থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু অস্ত্র গ্রহণ করেন।

পঞ্চম এবং শেষবার বঙ্গবন্ধুকে দেখি ১৯৭২ সালের ১০ মে। সেদিন হেলিকপ্টারে পাবনা স্টেডিয়ামে সকাল ১০টার দিকে অবতরণ করলে তাকে মাল্যদান করি। আমার সঙ্গে ছিলেন পাবনা পলিটেকনিক্যাল ছাত্র সংসদের জিএস আবদুল হাই তপন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম বিশ্বাস, আল মাহমুদ নিটু প্রমুখ।

মাল্যদানের সময় বঙ্গবন্ধুকে বলি ‘আমি রাঙা।’ পাবনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইছামতি পত্রিকার সম্পাদক। বগা চাচার বাড়িতে আপনাকে কবিতা শুনিয়েছিলাম। কথা শেষ না হতেই বঙ্গবন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে মাল্যদানের ছবি আমার কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে সার্কিট হাউসে চলে যান। একই দিন সন্ধ্যায় পাবনা বনমালী ইন্সটিটিউটে বঙ্গবন্ধুকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেখানে আমি নিজের লেখা মানপত্র বঙ্গবন্ধুকে অর্পণ করি।

নাগরিক সংবর্ধনায় বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান থেকে বঙ্গবন্ধুকে মাল্যদান এবং মানপত্র দেয়া হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংবর্ধনায় খুব আবেগঘন বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যের অনেক কথা এখনো স্মৃতির পাতায় অম্লান এবং অমলিন হয়ে আছে।

বঙ্গবন্ধু সেদিন অশ্রুসিক্ত নয়নে এই দেশ কিভাবে পুনর্গঠন করবেন তা বলতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। সবাইকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে কাজ করার আহ্বান জানান। সেদিন নাগরিক সংবর্ধনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। প্রায় একঘণ্টার বেশি সময় ধরে বঙ্গবন্ধু পাবনা স্টেডিয়ামে অবস্থানরত সমস্ত জনতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হলেন। শেষে জহুরুল ইসলাম বিশুর মায়ের নেতৃত্বে আওয়ামী মহিলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর গার্ড অব অনার গ্রহণ করে পাবনা সার্কিট হাউসে যান।

স্মৃতিচারণ করছেন আমিরুল ইসলাম রাঙা

জাগো নিউজ: বঙ্গবন্ধু শেষবার যখন পাবনা এসেছিলেন তখন কি তার সঙ্গে দেখা হয়েছে আপনার?

আমিরুল ইসলাম রাঙা: ১৯৭৩ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রব বগা মিয়া মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে বঙ্গবন্ধু শেষবার পাবনায় আসেন। আমার দুর্ভাগ্য সেবার দেখার সুযোগ হয়নি। এরপর ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হন।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো একশ’ বছর। একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শতবর্ষ বেঁচে থাকা হয়ত কিছুটা বিরল। তবে মহান ব্যক্তিরা শতবর্ষ কেন, হাজার বছর বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন।

এফএ/এইচএ/এমকেএইচ