ষাটোর্ধ্ব হাওয়া বেগম। পাবনার ফরিদপুর উপজেলার রতনপুর গ্রামে এক হতদরিদ্র পরিবারে বিয়ে হয়েছিল তার। পৈতৃক সূত্রে শ্বশুরবাড়ির ২ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন। স্বামী জবেদ আলী প্রামাণিকের আর কোনো জমিজমা ছিল না। কোনোরকম চলতে থাকে অভাবের সংসার।
তাদের কোলজুড়ে আসে ছেলে সন্তান। এরপর হাওয়া বেগমের কষ্টে সঞ্চয় করা ১৯০০ টাকা দিয়ে এক জোড়া গাভী কিনেন। স্বপ্ন ছিল তার ‘সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। হাওয়া বেগমের সে স্বপ্ন বৃথা যায়নি। সেই দুটি থেকে আজ তার খামারে ৪২টি গাভী। খামারের দুধ বিক্রির টাকায় চলছে সংসারের খরচ।
৩১ মে বড়াল নদী পাড়ে রতনপুরে গিয়ে কথা হয় হাওয়া বেগমের খামারে। জানালেন খামারের সুখ-দুঃখের ৪৫ বছরের কথা। বাড়ির জায়গা না থাকলেও এলাকায় বহু বছর আগে থেকেই ঘাসের প্রাচুর্য ছিল, ছিল গাভী পালনের বাথান। তিনি সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে শুরু করেন গাভী পালন। তার তিন ছেলে হাবিবুর রহমান, আব্দুল হাই ও বাকি বিল্লাহ। এদের বড় করার খরচ এসেছে গাভী পালনের আয় থেকে। তার তিন ছেলেও এখন খামারের ওপরই নির্ভরশীল। তাদের স্ত্রীরাও খামার দেখাশোনা করেছেন।
হাওয়া বেগম জানান, সব ছেলেরই কিছুটা জমিজমা আছেন। বাড়ির জায়গাও বাড়িয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে গরু পালনের জন্য। দুধের খামার না থাকলে তার সব ছেলেকে দিনমজুরি করা লাগত।
বড় ছেলের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা খাতুন জানান, তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ২৩-২৪ বছর। তিনি এসে দেখেন স্বামীর সংসারে গাভী ছাড়া কোনো সম্পদ নেই। তিনি তার শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে গাভী পালনের কাজে সহযোগিতা করতে থাকেন। তিনি নিজেই গাভী লালন-পালন, দুধ দোহনের কাজ করেন। শাশুড়ি তাকে সব কাজে সহযোগিতা করেন।
মেজ ছেলের স্ত্রী মঞ্জিলা খাতুন জানান, তিনি বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে গাভী পালনে সহযোগিতা করতে থাকেন। এখনতো তিনি সব গাভীকে নিজেই পরিচর্যা করেন। স্বামী অন্য পেশায় থেকে বাড়তি কিছু টাকা রোজগার করতে পারছেন। তার সন্তানরা লেখাপড়া করছেন।
বাড়ির ছোট ছেলের স্ত্রী সোহাগী খাতুন জানান, তিনি স্বামীকে শুধু সহযোগিতা নয় বাড়িয়েছেন গাভী সংখ্যাও।
তবে তারা জানান, অনেক দাম দিয়ে পশুর দানাদার খাবার কিনতে হয়। এতে দুধ বিক্রির বেশিরভাগ টাকা চলে যায়। সরকার যদি ভর্তুকি দিয়ে পশুর খাবারের দাম যদি কমিয়ে দিত, তাহলে তারা উপকৃত হতেন। এছাড়া গাভীর রোগ বালাই হলে তারা সরকারিভাবে কোনো চিকিৎসা সুবিধা পান না। অনেক টাকা দিয়ে প্রাণি চিকিৎসককে খামারে আনতে হয়।
খামারের মূল উদ্যোক্তা হাওয়া বেগম বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই দুধের দাম কমে যায়। সে সময় লোকসানের মুখে পড়তে হয়। সরকার কৃষকদের কার্ড দেয়। এতে তারা সার পায়, টাকা পায়। আমরা সরকারি কোনো সহযোগিতা পাই না। সরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা আরও লাভবান হতে পারতাম।’
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আল মামুন হোসেন বলেন, ‘হাওয়া বেগমের পরিবারের মতো অনেক প্রান্তিক শ্রেণির পরিবার গাভী পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এবার খামারিরা দুধের ভালো দাম পাচ্ছেন। করোনাকালে দুধের ভালো দাম নিশ্চিত করার জন্য সরকারি উদ্যোগেও ‘ভ্রাম্যমাণ দুগ্ধ ক্রয় কেন্দ্র’র মাধ্যমে দুধ কেনা হয়েছে। সরকার খামারিদের প্রতি সব সময়ই আন্তরিক।’
তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ অফিসের জনবল সীমিত। সীমিত জনবল দিয়েই তারা সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করেন।
আমিন ইসলাম জুয়েল/এসজে/এমএস