দেশজুড়ে

১২ বছর আগে গর্ভবতী হওয়া নারীকেও ভাতার কার্ড করে দিলেন চেয়ারম্যান

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে স্বামী পরিত্যক্তা এক নারীকে মাতৃত্বকালীন ভাতা দেয়া নিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন বোহাইলই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ। তার এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছেন বোহাইল ইউনিয়নের সংরক্ষিত তিন নারী ও ওয়ার্ড সদস্যরা (মেম্বার)।

অভিযোগে তারা আরও উল্লেখ করেছেন, শুধু ভাতা প্রদানেই নয়, চেয়ারম্যান কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের মতামত নেন না। বিভিন্ন প্রকার ভাতার তালিকা তিনি নিজেই তার লোকজন দিয়ে তৈরি করেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোহাইলই ইউনিয়নের চরমাঝিরা গ্রামের বাসিন্দা চায়না বেগম (৪২) নামের একজন নারীর সঙ্গে তার স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়েছে ১০ বছর আগে। এখন তিনি থাকেন বাবার বাড়িতে। অথচ চেয়ারম্যান তাকে মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন। এছাড়া নবজাতকের মা না হলেও তিনি নিজ ক্ষমতাবলে তার ভাতিজার স্ত্রীকেও মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন। ভাতিজার স্ত্রীও সর্বশেষ ১২ বছর আগে গর্ভবতী ছিলেন।

গত সোমবার (৩১ মে) সারিয়াকান্দি উপজেলার কড়িতলা বাজারে ব্যাংক এশিয়া এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায় ওই দুইজন নারীর ভাতার টাকা চেয়ারম্যান নিজেই তুলতে আসেন। তখন তিনি স্থানীয় জনতার তোপের মুখে পড়েন। এরপর বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চেয়ারম্যানের ভাতিজা স্ত্রীর নাম মিনতি বেগম (৪৫)। মিনতির স্বামীর নাম আলমগীর হোসেন। তাদের বাড়ি বোহাইল ইউনিয়নে যমুনা নদীর চরের মধ্যে। স্থানীয় লোককজন জানান, বোহাইল ইউনিয়নের চরমাঝিরা গ্রামের চায়না বেগমের ১০ বছর আগে একই চর গ্রামের ইমদাদুল হকের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তখন থেকে চায়না বাবা মোজা প্রামানিকের বাড়িতে বসবাস করে আসছেন। এরই মধ্যে ছয়মাস আগে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তার নামে একটি মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ড করে দেন চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ। বোহাইল চরের আলমগীর হোসেনের স্ত্রী মিনতি বেগমের ছেলে সন্তানের বয়স প্রায় ১২ বছর। তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের আপন বড় ভাই সাহাদাত হোসেনের ছেলে আলমগীরের স্ত্রী। এ কারণে তিনিও এই কার্ড পেয়েছেন।বোহাইল ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী মেম্বার রহিমা বেগম, সাহিদা বেগম ও নাছিমা বেগম অভিযোগ করেন, গত ডিসেম্বরে পরিষদের সমন্বয় সভায় চর এলাকার ৬০ জন গর্ভবতীর নামে ভাতা কার্ড করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ভাতা পাওয়ার জন্য প্রকৃত নারী নির্বাচন করার বিষয়টিও উঠে আসে সভায়। কিন্তু চেয়ারম্যান গোপনে স্বামী পরিত্যক্তা ও নিজের ভাতিজার স্ত্রীকে ভাতা কার্ড করে দিয়েছেন। এতে তারা লজ্জিত। চরের প্রকৃত গর্ভবতী নারীদের নাম বাদ দিয়ে তাদের নাম দেয়ায় ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি জানান তারা।

প্যানেল চেয়ারম্যান ও ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার বাদশা আকন্দ ও ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ও নারী সদস্যদের দুইটি করে গর্ভবতী নারীর নাম দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান কোনো কথা রাখেননি। তিনি মনগড়া গর্ভবতী নারীদের নামের তালিকা তৈরি করেছেন।’

তবে মনগড়া তালিকা তৈরির কথা অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ। তিনি বলেন, ‘আমি সবার মতামত নিয়ে তালিকা করেছি। যাদের নামের কথা বলা হচ্ছে অর্থাৎ আমার ভাতিজার স্ত্রী মিনতি বেগম ও স্বামী পরিত্যক্তা চায়না বেগমের নাম আমার অজান্তে তালিকায় উঠেছে।’

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে দরিদ্র মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কর্মসূচির নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার। এতে মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগীদের শর্ত ও যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো নারী প্রথম ও দ্বিতীয় গর্ভধারণের সময় যেকোনো একবার ভাতার আওতায় আসবেন। বয়স কমপক্ষে ২০ বছর বা তার বেশি হবে। মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার নিচে হবে। দরিদ্র বা প্রতিবন্ধী নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কেবলমাত্র বসতবাড়ি রয়েছে বা অন্যের জায়গায় বসবাসসহ নিজের বা পরিবারের কৃষিজমি কিংবা মৎস্যজমি নেই এমন নারী হতে হবে। উপকারভোগী নির্বাচনের সময় অবশ্যই ওই নারীকে গর্ভবতী থাকতে হবে। তিন বছর প্রতি মাসে ৮০০ টাকা হারে মাসিক ভাতা পাবেন তারা। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল মিয়া বলেন, ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হবে। সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসআর/এমকেএইচ