পাহাড়ের ঐতিহ্য টঙ ঘর। মাচাং ঘর নামেও এটি পরিচিত। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এ তিন জেলায় উঁচু নিচু ও আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়কে এক সময় বাড়তি নজর কাড়ত এই ঘর। এর বাহারি নকশা নিয়ে একে অপরে সঙ্গে প্রতিযোগিতাও কমতি ছিল না।
কালের বিবর্তন ও আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় পাহাড় থেকে শতকরা ৯৫ শতাংশ টঙ ঘর হারিয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে টিনের ঘর আর বড় বড় পাকা দালান। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো অনেকে টঙ ঘর টিকিয়ে রেখেছেন অনেকে।
ছাংগ্রাইতং পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা সানাইপ্রু মারমা (৮১) বলেন, ‘সব ঋতুতে টঙ ঘর আরামদায়ক। এসব ঘরে শীতকালে গরম ও গরমকালে ঠান্ডা অনুভূত হয়। তাই টঙ ঘরকে প্রাকৃতিক এসি ঘরও বলা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বড় ছেলে ঢাকায় একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। ওই সুবাদে একবার ঢাকা গেছিলাম। ওইখানে বালু, ইট, কনক্রিট ও সিমেন্ট দিয়ে গড়ে তোলা দালান কোঠার ঘরে তিনদিন থেকেছিলাম। পাহাড়ের সঙ্গে একটুও স্বাদ মেলাতে পারিনি।’
চিম্বুক ম্রো পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা কানত্লা ম্রো (৭৮) বলেন, ‘দেশ এখন আধুনিক। এর ছোঁয়া পাহাড়েও লেগেছে। এ কারণে পাহাড় থেকে টঙ ঘর বিদায় নেবার সময় এসে গেছে।’
তার মতে, মানুষ যদি পৃথিবীতে এসে বিদায় নিতে হয়। তাহলে মানুষের সৃষ্টি টঙ ঘরের বিদায় হবে না কেন। যে জিনিসের শুরু থাকবে ওই জিনিসের নির্দিষ্ট একটা সময়ের শেষও আছে।’
রুমা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমা বলেন, ‘টঙ ঘরকে বাংলায় অনেকে মাচাং ঘর হিসেবে জানে। টঙ আমাদের পাহাড়ের ঐতিহ্য। নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষার্থে টঙ ঘরকে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে টিকিয়ে রাখা দরকার।’ থানচি তিন্দুক এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মংনিংঅং মারমা (৮১) বলেন, ‘টিন এক বান কিনতে অনেক টাকা লাগে। কিন্তু কোনো খরচ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গাছ, বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যায় টঙ ঘর। পাহাড়েও আগের মতো যেখানে সেখানে চাহিদা অনুযায়ী গাছ, বাঁশ পাওয়া যায় না। তবুও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো টঙ ঘরে বসবাস করছি।’
গ্রাম প্রধান ক্যমং (৬৫) জাগো নিউজকে বলেন, ‘বান্দরবান থেকে আমার গ্রামে দূরত্ব ৯০ কিলো হবে। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন রাস্তাঘাট, গাড়ি ঘোড়া কোনোকিছু ছিল না। আর এখন যখন মন চায় তখন বান্দরবান চলে যাচ্ছি, আবার ফিরে আসতেও পারছি। এ বছর আমাদের এলাকার সড়কে পিচ ঢালাই কাজ চলছে। শুনেছি এ পিচ ঢালাই সড়ক সীমান্ত পর্যন্ত যাবে। দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও পরিবর্তন হচ্ছি।’
খাগড়াছড়ি সর্বশেষ সীমান্ত রামগড় কলসিমুখ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা বাবু মারমা। বয়স তার ২২ কিংবা ২৩। বাবু এখন ফেনী কম্পিউটার ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকাতে আগে সব টঙ ঘর ছিল। এখন আর আগের মতো টঙ ঘর দেখা যাচ্ছে না।’
পরিবেশ অধিদফতরে জুনিয়র কেমিস্ট আব্দুল সালাম বলেন, ‘পাহাড়ের ১১টি জনগোষ্ঠী দীর্ঘযুগ ধরে টঙ ঘরে বসবাস করে আসছেন। টঙ ঘর তৈরিতে প্রাকৃতিক গাছ, বাঁশ, ছন প্রয়োজন হয়। তবে এখন আর পাহাড়ের টঙ দেখা যায় না বললেই চলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ, বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে রোল মডেল, প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে দেশ দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে পাহাড়েরও সবকিছু পরিবর্তন হচ্ছে।’
এসজে/এমকেএইচ