ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা ফয়সাল হাসান শাওনের পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য সবই এখন ধ্বংসের পথে। একটি আলোচিত ঘটনার খবর ফেসবুকে পোস্ট করাই যেন তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ঘটনাস্থলে না থেকেও’ হয়েছেন মামলার আসামি।
চরভদ্রাসনের সাবেক উপজেলা পরিষদের দুবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হোসেনের জ্যেষ্ঠ সন্তান ফয়সাল হাসান শাওন। তিনি নিজেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। বাতিল হয়ে যাওয়া চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান প্রার্থীও হয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ নেতা শাওনের দাবি, যে ঘটনার সূত্র ধরে দায়েরকৃত মামলায় তিনি আসামি হয়েছেন, ওই ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তিনি শুধু ওই ঘটনার ওপর একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের তথ্য বিবরণী ও সূত্র উল্লেখ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। অথচ তাকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ এপ্রিল ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় লকডাউনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়। এ ঘটনায় থানায় ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়। সালথা উপজেলা ভূমি অফিসের নৈশপ্রহরী সমীর বিশ্বাস ওই রাতে ভূমি অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ৪৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩-৪ হাজার জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় ৪৮ নম্বর আসামি হিসেবে ফয়সাল হাসান শাওনের নাম রয়েছে।
ফয়সাল হাসান জাগো নিউজকে জানান, ঘটনার রাতে তিনি চরভদ্রাসনের বাড়িতে ছিলেন। ফেসবুকে একটি অনলাইন পত্রিকায় সালথার ওই ঘটনার খবর দেখতে পেয়ে তিনি খবরটি সেখান থেকে কপি করে পোস্ট করেন। খবরের সূত্রও সেখানে উল্লেখ করেন। এরপর ওই রাতেই সালথার একজন সরকারি কর্মকর্তা তাকে ফেসবুকে ওই পোস্ট দেয়ার ব্যাপারে জানতে চান এবং তার বিরুদ্ধে ওই সাংবাদিককে এসব তথ্য দেয়ার অভিযোগ আনেন। তিনি তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলেও জানান।
এতে ঘাবড়ে যান ফয়সাল হাসান এবং পোস্টটি তখনই ডিলিট করে দেন। এর পরেরদিন তার পরিচিত আরও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা তাকে ফোন করে এ ব্যাপারে জানতে চান। এর দুদিন পরে সালথা থানার একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ফোন করে তাকে জানান যে, ওই রাতের ঘটনায় দায়েরকৃত সর্বশেষ মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ওই রাতে যে আমি সালথা নয় বরং চরভদ্রাসনে ছিলাম সেটি আমার ফেসবুক পোস্ট কিংবা মোবাইল লোকেশন পরীক্ষা করলেই বেরিয়ে আসবে।’
ফয়সাল হাসান বলেন, পুলিশ জানিয়েছে ওই ঘটনার মামলায় নিরীহ কাউকে হয়রানি করা হবে না। অথচ তার সন্ধানে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে কয়েক দিন আগেও অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তিনি বাড়িতে থাকতে পারছেন না। নিজেকে আত্মগোপনে রাখায় ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় শয্যাশায়ী। এই মুহূর্তে তিনি অসুস্থ বাবার পাশেও থাকতে পারছেন না। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ। এখনো তদন্ত চলছে। চার্জশিট কবে নাগাদ দিতে পারব বলতে পারছি না। তবে একটু দেরি হবে।’
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান অবশ্য ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের পর এ ব্যাপারে জানিয়েছিলেন, কারো সন্দেহ হলে এজাহারে যে কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারেন। তবে তিনি আসলেই জড়িত কি-না তা তদন্তেই বেরিয়ে আসবে। নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন সেদিকেও খেয়াল রাখা হবে।
প্রসঙ্গত, গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় একজন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালথার ফুকরা বাজারে লকডাউন কার্যকারের অভিযানে গেলে স্থানীয় জনতার প্রতিরোধে পড়েন। পরে এ নিয়ে থানা ও সরকারি অফিসগুলোতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট হয়।
এ ঘটনায় আহতদের মধ্যে দুজন মারা যান। এসব ঘটনায় কয়েকজনের নাম উল্লেখসহ তিন হতে চার হাজার জন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করা হয়।
এ পর্যন্ত প্রায় ১২০ জনেরও বেশি এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। এদের মধ্যে একজন রিমান্ডে থাকাবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে পুলিশ জানায়।
এন কে বি নয়ন/এসআর/এমএস