দেশজুড়ে

‘বারবার নদীভাঙনে আমাদের জীবন এখন পাখির মতো’

পাবনার বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের পূর্ব শ্রীকণ্ঠদিয়া চর এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আকবার আলী সরদার। যমুনা নদীর তীরে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু নদীর তীব্র ভাঙনে তার একমাত্র ভিটে-বাড়িটি এখন বিলীনের পথে। অসহায় বৃদ্ধ ভিটে-বাড়ির মায়া ছেড়ে ঘর ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছেন অন্য জায়গায়।

বৃদ্ধ আকবার আলী (৬২) বলেন, ‘৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এই বাড়িতে ছিলাম। এখন বাড়ির ফলন্ত গাছ ও ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে।’

বৃদ্ধ আকবার আলীর স্ত্রী জাহানারা খাতুন বলেন, ‘বিয়ের পর এ বাড়িতেই উঠেছিলাম। তারপর কেটে গেছে জীবনের এতগুলো বছর। এখন যমুনার ভাঙনের মুখে বসতভিটা ছাড়ছি।’

শুধু এই বৃদ্ধ দম্পতি নন, বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন ইউনিয়নের আগবাগসোহাগ, পূর্ব শ্রীকণ্ঠদিয়া, চর শাফুল্লা, খয়েরবাগান বাজার চর এলাকার চার শতাধিক মানুষ।

ঘরের চালা ভেঙে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় হাইস্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন উপজেলার পূর্ব শ্রীকণ্ঠদিয়ার শামসুল হক (৫০)। তিনি বলেন, ‘এখন অন্য কোথাও অস্থায়ী বসত গড়তে হবে। পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব তার কিছুই জানি না। যথাসময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যবস্থা নিলে ৪০ বছরের বসতভিটা হারাতে হতো না।’

নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারা বাচ্চু মিয়া (৫৫) বলেন, ‘এ বয়সেই দুই-তিনবার ভাঙনের শিকার হয়েছি। বারবার নদীভাঙনে আমাদের জীবন এখন পাখ-পাখালির মত হয়ে গেছে। এখানে ঘর তুলি তো ছয় মাস পর আবার নতুন জায়গায় ঘর বাঁধি।’

পূর্ব শ্রীকণ্ঠদিয়ার আরেক বাসিন্দা নূর আলম (৩০) বলেন, ‘চর এলাকাগুলো প্রতিবছরই ভাঙনের শিকার হয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয় না।’

চরের বাসিন্দা নূর আলম (২৫) নামের এক যুবক বলেন, ‘দুই বছর আগে তাদের অনেকজন আশ্বাস দিয়েছিলেন ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু কিছুই হয়নি।’

৮০ বছরের বৃদ্ধ চান মিয়া জানান, এই চরেই তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। চর ভেঙে গেলে কোথায় যাবেন তা তিনি জানেন না।

চরের বাসিন্দা শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জানান, গত বছর পর্যন্ত আগবাগসোহাগ, পূর্ব শ্রীকণ্ঠদিয়ার ও চর সাফুল্লা এলাকার সহস্রাধিক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। ভেঙে গেছে কমিউনিটি ক্লিনিক। মৌলভীপাড়া জামে মসজিদ, আগবাগসোহাগ জামে মসজিদ, চর সাফুল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। আট শতাধিক বাড়িঘর রয়েছে হুমকির মুখে। এখনই উদ্যোগ নেয়া না হলে ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে এসব চরের মানুষ।

তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ইলিয়াস হোসেন রব্বানী (৩৫) বলেন, বেড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের সীমানার মধ্যে এসব চরের মানুষের বসবাস। পাঁচজন চেয়ারম্যান একযোগে চেষ্টা চালালেও ভাঙনরোধে বেড়িবাঁধ করা যেত। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। শতবর্ষী স্থায়ী এ চরগুলোকে রক্ষায় কেউই কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’

বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ও চরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান তাহের (৪৫) বলেন, ‘ইউনিয়নটির তিনটি গ্রাম চরম ভাঙনের মুখে। ভাঙনের শিকার হওয়া মানুষজন বিভিন্ন স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যাদের কেউ নেই তারা চরের একমাত্র শ্রীকণ্ঠদিয়ার উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ভেঙে যাওয়া মসজিদ ঘরের সামগ্রীও বিদ্যালয়ের মাঠে রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার নিজের বাড়িও ভাঙনের মুখে। ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে বারবার আবেদন করা হলেও কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনও এসব এলাকায় আসেন না।’

নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল কালাম মোল্লা চরগুলো রক্ষা করার দাবি জানান। নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বহু প্রতিশ্রুতি আসে। কিন্তু ভোটের পর আর কারও খোঁজ পাওয়া যায় না।’

এ বিষয়ে উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হামিদ বলেন, ‘সরেজমিনে দেখতে খুব শিগগিরই চর এলাকাগুলোতে লোক পাঠানো হবে। জরুরি ভিত্তিতে বালির বস্তা ফেলে ভাঙনরোধ করা যায় কি-না তা খতিয়ে দেখা হবে। সরেজমিন পরিদর্শনের রিপোর্ট ঢাকায় পাঠানো হবে। ঢাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেকনিক্যাল কমিটি যদি মনে করে সেখানে ভাঙনরোধে কোন প্রকল্প হাতে নেয়া দরকার, তাহলে তা বাস্তবায়ন হতে পারে।’

আমিন ইসলাম জুয়েল/এসজে/এএসএম