ফরিদপুরের গর্ব তরুণ ক্রিকেটার নাইম শেখ। এক সময় জেলা শহরের পাড়া-মহল্লার মাঠ কাঁপিয়ে বেড়ানো তরুণ আজ বাংলাদেশ জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ওপেনার। যিনি এবার গেছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মাতাতে।
নাইমের বাড়ি ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকায়। পিতার নাম আবদুল আজিজ শেখ, মা কেয়া বেগম। চার ভাইবোনের মধ্যে নাইম দ্বিতীয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নাইমের ক্রিকেটার হয়ে ওঠা বেশি দিনের নয়। ফরিদপুর সদরের রিয়াজউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেন তিনি। এরপর ফরিদপুর জুনিয়র ক্রিকেট কোচিং ক্লাবে ভর্তি হন।
ফরিদপুর জেলার হয়ে সর্বোচ্চ রান করার পর ঢাকা বিভাগের হয়ে খেলে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। ২০১৬ সালে চ্যালেঞ্জ কাপে অংশ নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা ব্যাটসম্যান হন নাইম। সেই থেকে শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানকে।
নাইম মূলত পেশাদার ক্রিকেট খেলা শুরু করেন এইচএসসির পর থেকে। অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেট খেলা হয় তখন থেকেই। এরপর ডাক পড়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচে এক ফিফটির সাহায্যে ১২২ রান করেন নাইম। বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফিরে ওই বছরেরই ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে রূপগঞ্জের হয়ে ৫৫৬ রান করেন। একই বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় ঢাকা মেট্রোপুলিশ ক্রিকেট দলের হয়ে। ২০১৯ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে রূপগঞ্জকে রানার্সআপ করতে বড় অবদান রাখেন নাইম। ১৬ ম্যাচে ৩ সেঞ্চুরি আর ৫ ফিফটিতে লিগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮০৬ রান করেন তিনি।
নাইমের জাতীয় দলে অভিষেক ২০১৯ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ফরমেট দিয়ে। এরপর থেকে দেশের হয়ে ২২টি টি-টোয়েন্টি খেলে ফেলেছেন এই বাঁহাতি। ওয়ানডেও খেলেছেন ২টি।
সাফল্যের ধারাবাহিকতায় জায়গা পেয়েছেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে। গত রোববার (৩ অক্টোবর) রাতে জাতীয় দলের সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করেন নাইম।
২২ বছর বয়সী এই তরুণকে নিয়ে ভীষণ আশাবাদী ক্রিকেটপ্রেমীরা। নাইম বিশ্বকাপেও মাঠ কাঁপাবেন, এমন প্রত্যাশায় দিন গুনছেন তার বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনসহ ফরিদপুরের সাধারণ মানুষ।
নাইমের বড় ভাই নাদিম শেখ জানান, ‘ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক ছিল নাইমের। এক কথায় ক্রিকেটপাগল ছিল। বাড়ির পাশের মহিম স্কুলের মাঠ, হিতৈষী স্কুল মাঠ, জিলা স্কুল মাঠ, হাইস্কুল মাঠসহ শহরের সব মাঠেই ক্রিকেট খেলতো সে। জেলার ভেতরে বাইরে কোথাও ক্রিকেট খেলা হলেই ডাক পড়তো নাইমের তার।’
তিনি আরও জানান, ‘নাইমের জাতীয় দলের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল, তিনি হলেন ফরিদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক ও ক্রিকেট দলের কোচ মোখলেসুর রহমান বাবলু।’
ফরিদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক ও ক্রিকেট কোচ মোখলেসুর রহমান বাবলু তার শিষ্যকে নিয়ে বলেন, ‘নাইম ২০১৫ সালের প্রথমদিকে আমার কাছে আসে। আমি তাকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে গড়ে তুলেছি। তখন থেকেই তার মধ্যে একটি বিষয় দেখতাম, যেভাবে শিখিয়ে দিতাম, সেখাবেই অনুশীলন করতো। খুবই পরিশ্রমী, মেধাবী, বিশ্বস্ত, নম্র ও ভদ্রতার দিক দিয়ে দারুণ একটি ছেলে। আমার চেষ্টা আর নাইমের কঠোর পরিশ্রম তাকে আজ যোগ্যতার শিখরে নিয়ে গেছে বলে মনে করি।’
নাইমের বাবা আবদুল আজিজ শেখ বলেন, ‘আমার তিন ছেলে এক মেয়ে। নাদিম, নাইম, সাইম ও মেয়ে সায়মা। এদের মধ্যে নাইম দ্বিতীয়। স্থানীয় রিয়াজউদ্দিন স্কুলে লেখাপড়া জীবন শুরু। সেখান থেকেই এসএসসি পাশ করার পর ফরিদপুর মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সারাদিন ক্রিকেট নিয়েই সে পড়ে থাকতো। যার কারণে নাইম এইচএসসিতে ইংরেজিতে খারাপ করে। এই ক্রিকেট খেলার জন্য নাইমকে অনেক গালমন্দ, বকুনি দিয়েছি। বহুবার বকুনি খেয়েও ক্রিকেট ছাড়েনি সে। ফরিদপুরের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের এমন কোনো মাঠ নেই, যেখানে নাইম ক্রিকেট খেলতে যায়নি। ক্রিকেট খেলে সে অনেক পুরস্কার জিতেছে। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার কারণে এক পর্যায়ে নাইমকে ২০১৬ সালে ফরিদপুর ক্রিকেট কোচিং একাডেমিতে ভর্তি করি। সেখান থেকেই তার পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে পথচলা শুরু।’
নাইমের মা কেয়া বেগম বলেন, ‘আমি তাকে ক্রিকেট খেলায় উৎসাহ দিতাম। শুরু থেকে তার প্রতি আমার দোয়া রয়েছে। আমি প্রত্যাশা করি আমার ছেলে বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে ভালো খেলবে। বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নাইমের পাশাপাশি আমার আরেক ছেলে (নাইমের ছোট ভাই) সাইমও ক্রিকেট খেলায় বেশ পারদর্শী। সেও নাইমের মতো একদিন ভালো করবে, দেশের হয়ে জাতীয় দলে স্থান পাবে আশা করি। ফরিদপুরবাসী ও দেশবাসীর কাছে নাইমের জন্য দোয়া চাই।’
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও ফরিদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি অতুল সরকার বলেন, ‘ফরিদপুরের সন্তান নাইম শেখ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওপেনার। এটা ফরিদপুরবাসীর জন্য একটা বড় গর্বের বিষয়। সে ফরিদপুর তথা সারা দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনুক, এই কামনা করি।’
এন কে বি নয়ন/এমএমআর/এমএস