দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতার অনুমোদনহীন ব্যাটারি পোড়ানোর কারখানার আশপাশের জমির ঘাস খেয়ে ২ মাসে ১৬টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছে অসংখ্য গরু। এসবের প্রতিবাদ করায় এলাকাবাসীদের হুমকি দিচ্ছেন কারখানা মালিক।
কারখানার বিষাক্ত ধোয়ার ফলে গরুগুলোর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাণিসম্পদ অফিস জানিয়েছে।
কারখানার মালিক আব্দুল মালেক উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য। তার কাছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে দিনাজপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক একেএম ছামিউল আলম কুরশি বলেন, তিনি (আব্দুল মালেক) আমাদের কাছে ছাড়পত্রের জন্য আবেদনই করেননি। ছাড়পত্র দিলাম কীভাবে? সম্প্রতি এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়- কারখানাটি গড়ে ওঠার পর গত ২ মাসে সকাল রায়ের ৩টি গরু, বিমল রায়ের ১টি গরু, বাবুল রায়ের ১টি গরু, পরেশ রায়ের ১টি গরু, সুবাশ রায়ের ২টি গরু, আশুতোষ রায়ের ২টি গরু, আলতাফ হোসেনের ২টি গরু, আনোয়ার হোসেনের ১টি গরু, সুশিলা রায়ের ১টি গরু ও শাহ আলমের ২টি গরু মারা গেছে। গরুগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। এছাড়াও এই গ্রামের ৮ থেকে ১০টি গরু অসুস্থ অবস্থায় রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দিনাজপুর সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে আত্রাই নদী। এই নদীর পাশেই চিরিরবন্দর অংশে নানিয়াটিকর গ্রামের আম ও লিচুর বাগান। সেই বাগানের এক পাশে ৪ মাস আগে ৯নং ভিয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য আব্দুল মালেক অবৈধভাবে ব্যাটারি পোড়ানোর কারখানা স্থাপন করেন। কারখানায় যানবাহন যাতায়াতের জন্য বাঁধ কেটে বানানো হয়েছে রাস্তা।
রাতের আঁধারে ট্রাকে করে পুরাতন ব্যাটারি নিয়ে এসে পুড়িয়ে সীসা তৈরি করা হয়। এরপর সেই সীসাগুলো ট্রাকে করে ঢাকায় বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে পাঠানো হয়। সম্প্রতি ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কারখানাটি গুড়িয়ে দিয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে আলু, টমেটো, ভুট্টা, বোরো ধানের ক্ষেত। আম, লিচু, জাম, কাঁঠালসহ হরেক রকমের গাছপালা। সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে আত্রাই নদী। আর সেই নদীর বাঁধ ঘেঁষে পূর্বপাশে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির কারখানা স্থাপন করেছেন আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তি। আব্দুল মালেক ভিয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য।
কারখানার কাছে যেতেই পাওয়া গেলো ঝাঁঝালো পোড়া গন্ধ। আম ও লিচু বাগানের ভেতরে ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির জন্য টিন দিয়ে ঘেরা কারখানায় রয়েছে একটি ডিজেলচালিত জেনারেটর। কারখানার আশপাশের গাছগুলোর পাতা ঝলসে গেছে। চারপাশে পুরাতন ব্যাটারি আর ব্যাটারির ভগ্নাংশ।
স্থানীয়রা জানান, রাতে এখানে ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয় পুরাতন ব্যাটারি। সেই ব্যাটারি কেটে প্লাস্টিক আলাদা করা হয়। তারপর সেই ব্যাটারির ভারি ধাতু গলিয়ে সীসা তৈরি করে আবার ট্রাকে করে পাঠানো হয় ঢাকায়। রাতভর চলে এই কর্মযজ্ঞ। ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে রাতের বেলায় দুর্গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। কারখানাটি চালু করার পর থেকেই ওই গ্রামের গরু ও ছাগলের শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। গত ২ মাসে ১৬টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। এলাকায় অসুস্থ গরুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অনেকে নামমাত্র মূল্যে গরুগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন।
কারখানার আশপাশের বহু আম, লিচু ও কাঁঠালের গাছ পুড়ে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে কারখানার কার্যক্রম শুরু করে কর্তৃপক্ষ, যা চলে ভোর পর্যন্ত।
গ্রামের বাসিন্দা সূর্য বালা বলেন, হামার বহুত ক্ষতি হইছে। ৫ হাজার টাকায় মোক গরু বিক্রি করতে হলি। এই ব্যাটারি কোম্পানির কারণে মুই একেই বারেই শেষ হই গেছু। এখন মোর একখানই দাবি এই ব্যাটারির কারখানা বন্ধ হোক।
কৃষক পরেশ চন্দ্র বলেন, ব্যাটারির কারখানার কারণে আমার একটি গরু মারা গেছে। একটা গরু অসুস্থ হয়ে বাড়িতে আছে। আমাদের ক্ষতি করে এমন কোনো ফ্যাক্টরি দরকার নাই। তাই এই কারখানা বন্ধের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কমল রায় বলেন, কারখানার কারণে আমার ওয়ার্ডের নানিয়াটিকর গ্রামের অনেক গরু মারা গেছে। এছাড়া মানুষের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এলাকার লোকজন কারখানাটি ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু তারা আবার কারখানা চালু করেছে। এলাকাবাসীকে ইউনিয়নে অভিযোগ দিতে বলেছি।
কারখানার মালিক আব্দুল মালেক বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে, আমাকে আগামী ৫ মার্চের মধ্যে কারখানা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। আমি সেই সময়ের মধ্যে কারখানা সরিয়ে নেবো।
চিরিরবন্দর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সারফরাজ হোসেন বলেন, নানিয়াটিকর গ্রামে একাধিক গরুর মৃত্যুর খবর শুনে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি। এছাড়া অসুস্থ গরুগুলোকে চিকিৎসা প্রদান করেছি। ব্যাটারি পোড়ানোর কারখানার বিষাক্ত ধোয়ার ফলে গরুগুলো মারা গেছে। এই কারখানা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে মানুষের জন্য ক্ষতি হতে পারে।
চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। তারা (কারখানা কর্তৃপক্ষ) খুব খারাপ কাজ করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে কারখানাটি বন্ধ করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
দিনাজপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক একেএম ছামিউল আলম কুরশি জানান, ব্যাটারির পোড়ানোর কারখানার জন্য ছাড়পত্র দেওয়ার কোনো নিময় নেই। তিনি আমাদের কাছে কোনো আবেদনই করেননি। কাজেই ছাড়পত্র থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ পাওয়ার পর আমাদের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই কারখানাটি বন্ধ করার জন্য বলেছে। যদি তারা কারখানা বন্ধ না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানা যাবে।
এমদাদুল হক মিলন/এফএ/জিকেএস