দেশজুড়ে

আহসানগঞ্জে পুরোনো রেললাইনে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ

অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ রেলস্টেশনের কোটি টাকার সম্পদ। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে রেললাইনের সরঞ্জামসহ মূল্যবান জিনিস। সেই সঙ্গে রেলওয়ের বিস্তীর্ণ জায়গা বেদখল হয়ে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ঘড়বাড়ি, মাছের আড়ত এবং মার্কেট।

জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে আত্রাই পুরোনো স্টেশন থেকে আত্রাই নদী (বর্তমান আহসানগঞ্জ স্টেশন) পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চারটি লাইন নির্মাণ করা হয়। লাইন চারটি আহসানগঞ্জ স্টেশনের নিচে পূর্ব দিকে অবস্থিত। তিন লাইন আত্রাই নদী পর্যন্ত গেছে। ট্রেনের ওয়াগনে করে এ তিন লাইন দিয়ে পাটের বেল, পোশাক, সার ও লালিসহ (গবাদিপশুর খাদ্য) বেশকিছু পণ্য আনা-নেওয়া করা হতো।

আরও পড়ুন: রেল যাবে মাতারবাড়ি, গাজীপুরে ওয়ার্কশপসহ মহাপরিকল্পনা

অপর লাইনটি সরাসরি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তিন হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার সার গুদামে প্রবেশ করেছে। এ লাইন দিয়ে ওয়াগনে করে গুদামে সার যেত। সরাসরি খুলনা ও যশোর থেকে ট্রেনে করে গুদামে আনা হতো সার। স্থানীয় আব্দুল মালেক ও আব্দুর রশীদ পাটোয়ারি বলেন, বছরের পর বছর পড়ে থাকায় লাইনে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। লাইন রক্ষায় রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। এছাড়া রেলের স্থাপনা সরিয়ে ফেলে সরকারিভাবে মার্কেট করা হলে রাজস্বের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

লাইনের উপর গত ৩০ বছর ধরে স্থাপনা গড়ে বসবাস করছেন নাটোরের নলডাঙ্গা গ্রামের আলম হোসেন। তিনি বলেন, আমরা অনেক বছর আগে গ্রাম থেকে এসে এখানে বসবাস শুরু করি। বর্তমানে পরিবারের সদস্য আটজন। সবাই পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার মতো এখানে প্রায় শতাধিক পরিবার থাকে। এখন পর্যন্ত তাদের কেউ কিছু বলেনি। তবে উচ্ছেদ করলে চলে যেতে হবে।

ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের বয়জ্যেষ্ঠ রামপদ শীল বলেন, আত্রাই পুরাতন স্টেশন থেকে আত্রাই নদী বা বর্তমান আহসানগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চারটি লাইন আছে। যেখানে একটি লাইনে ট্রেনের ওয়াগনে করে আত্রাই গুদামে সার আসতো। বাকি তিন লাইন নদীর ঘাট পর্যন্ত গেছে। এসব লাইন দিয়ে পাট ও লালিসহ বিভিন্ন পণ্য আনা-নেওয়া হতো। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় লাইনে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে।

১৯৯৫ সাল থেকে ডিলারশিপ নিয়ে সারের ব্যবসা করছেন আহসানগঞ্জের মেসার্স নাজমুজ্জামানের ডিলার নাজমুল হক। তিনি বলেন, যশোরের নামোপাড়া উপজেলায় আমার সারের বরাদ্দ ছিল। বছরে ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার আসে। ডিলারশিপ পাওয়ার তিন বছর পর্যন্ত ট্রেন যোগে সরাসরি আত্রাই সার গুদামে আনতাম। তিন বছর পর রেলপথে সার আসা বন্ধ হয়। এরপর সড়কপথে আনা শুরু করলাম। সড়কপথে খরচ অনেক বেশি। রেলে খরচ অনেক কম ছিলো। রেল যোগাযোগ চালু হলে সুবিধা হয়। এখন সরকার চালু করবে কিনা সেটাও একটা বিষয়।

আত্রাই উপজেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি সামছুল হক বলেন, উপজেলায় ১০ জন ডিলার রয়েছে। প্রথম দিকে রেলে সার আসতো। তা বন্ধ হওয়ার পর সড়কপথে আসা শুরু হয়। তবে রেলপথে খরচ কিছুটা কম হলেও সড়কে দ্রুত সময়ে সার আসে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) আত্রাই গুদামরক্ষক শামিম রেজা বলেন, ১৯৮৩ সালে গুদামের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ১৯৮৫ সালে হস্তান্তর করে। ১৯৮৬ সালে রেলপথে গুদামে সার আসা শুরু হয়। কয়েক বছর সার আসার পর গুদাম বন্ধ হয়ে যায়। সার গুদাম যখন বন্ধ ছিল তখন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০১২ সাল পর্যন্ত এখানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। একই বছর তারা আবার বিএডিসিকে হস্তান্তর করে। সে বছরই সড়কপথে গুদামে সার আসা শুরু হয়। দীর্ঘদিন গুদাম বন্ধ থাকায় রেললাইনও অকেজো হয়ে যায়। এতে লাইন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আত্রাই স্টেশন মাস্টার সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রায় এক কিলোমিটার রেললাইন পড়ে আছে। এতে ফিসপ্লেট, নাট-বোল্ট, রেলের নিচের কাঠ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এবং মাটির নিচে চাপা পড়ে নষ্ট হচ্ছে। কোটি টাকার রেললাইনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি রেলের জায়গা দখল করে যে যার মতো স্থাপনা নির্মাণ করেছে। বিষয়টি রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান অফিসে একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এএইচ/এএসএম