দেশজুড়ে

কংক্রিটের শহরে প্রশান্তি বিলাচ্ছে আব্দুল ওয়াহাবের ছাদবাগান

কংক্রিটের শহর থেকে দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে ফুল ফলের গাছ। কিন্তু মানুষ তার শিকড়কে সহজে ভুলতে পারে না। কিছু মানুষের সখের ছাদবাগানে পরশ মেলে সবুজ প্রকৃতির। তেমনই সৌখিন এক ব্যক্তি মো. আব্দুল ওয়াহাব। জনতা ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার মো. আব্দুল ওয়াহাবের ছাদবাগানে দেখা মেলে ভিন্ন এক প্রকৃতির। যেখানে গেলেই সবুজের সমারোহে ভোরে ওঠে মন।

১৯৭৬ সালে জনতা ব্যাংকে চাকরিতে যোগদান করে ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরঙ্গী মোড়ে পাঁচতলা মসজিদ এলাকায় বাড়ির কাজ শুরু করেন মো. আব্দুল ওয়াহাব। এরপর ১৯৯৭ সালে বাড়ির ছাদে ফুলের বাগান করা শুরু করেন। ফুল বাগানের পাশাপাশি সেখানেই ২০০০ সাল থেকে ফলদ ও ঔষধী গাছের বাগান শুরু করেন তিনি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আব্দুল ওয়াহাবের ছাদবাগানে ফুল, ফল ও ঔষধী গাছসহ প্রায় ১৫০ প্রজাতির ৬ শতাধিক দেশি ও বিদেশি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ফলদ গাছ রয়েছে ৪৩ প্রকার, ফুলের গাছ রয়েছে ৪৫ প্রকার ও ঔষধী গাছ রয়েছে ১৫ প্রকার। ব্যাংকে চাকরি করার সুবাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব গাছ সংগ্রহ করেছেন। ছাদে বাহারী রঙের টবে এসব গাছ তাদের সোভা ছড়াচ্ছে।

ছাদবাগানে ফলদ গাছের মধ্যে রয়েছে দেশি বিদেশি মিলিয়ে ২০ প্রকারের ৪০টি আম গাছ, সাদা ও কালো রঙের জাম গাছ রয়েছে দুটি, স্ট্রেবেরি, মাধুরি ও থাইল্যান্ডের পেয়ারা গাছ রয়েছে ৭টি, মঙ্গলবাড়ি, চায়না-থ্রি প্রজাতির লিচু গাছ আছে ৩টি, একটি দেশি আতাফল, একটি শরীফ, টক ও মিষ্টি কামরাঙ্গা গাছ আছে ২টি, মিষ্টি জলপাই একটি, নারিকেল ও বাউকুলের গাছ আছে ২টি, বিভিন্ন প্রকারের লটকন গাছ আছে ৩টি, আনার ও ডালিম গাছ ৩টি, বড় লম্বা গুল সফেদা গাছ ৩টি, চায়না ও দেশি কমলা ২টি, থাই ও দেশি মাল্টা গাছ ৪টি, লাল সাদা মিষ্টি জাম্বুরা গাছ ৩টি, দেশি ও বিদেশি লেবু গাছ ৬টি, গোলাপজাম একটি, দেশি জামরুল একটি, দেশি ও হাইব্রিড আমলকি ২টি, দেশি আমড়া একটি, একটি বিদেশি রামবোটান, একটি বিদেশি এপ্রিকট, একটি বিদেশি মিরাক্কেল, একটি বিদেশি কিউই, একটি বিদেশি জুজুবি, একটি আমেরিকান এভাকোডা, একটি বিদেশি লোকাট, একটি বিদেশি পিনাটবাটার, ২টি বিদেশি জাবাটিকাবা, একটি বিদেশি আলু বোখারা, একটি বিদেশি পিচফল, একটি বিদেশি পেস্তাবাদাম, বিদেশি কৎবেল একটি, একটি বিদেশি অলিভ, ২টি বিদেশি ব্ল্যাকবেরি, দেশি বিদেশি মালবেরি ২টি, মিশরীয় ও দেশি ডুমুর ২টি, দেশি অড়বরই একটি, বিদেশি ম্যাঙ্গো স্ট্রিং একটি, কালো ও সবুজ আঙ্গুর ২টি, রেডলেডি ও দেশি পেঁপে ২টি, সবুজ ও হলুদ রঙের ড্রাগন গাছ ৪টি।

ছাদ বাগানে দেশি বিদেশি ফুলগাছের মধ্যে রয়েছে, হলুদ, সাদা-বেগুনি-তাজমহল ও বিদেশি মিলিওসহ ১০টি গোলাপ ফুলের গাছ, হলুদ-গোলাপি-সাদা-বিদেশি জবা গাছ ৫টি, লাল-সবুজ-হলুদ-গোলাপি-সাদা-চিন দেশিসহ ৫টি রঙ্গন গাছ, দেশি বিদেশি চন্দ্র মল্লিকা ৪টি, সাদা কনকচাঁপা ২টি, সাদা স্বর্ণচাপা ২টি, সাদা রঙের কাঁঠালীচাঁপা, সাদা দোলনচাঁপা একটি, এরোমেটিক দেশি বিদেশি জুই গাছ ৭টি, বিদেশি চামেলি ২টি, সাদা বেলি একটি, লাল গোলাপি করবী ৪টি, বিদেশি নার্গিস একটি, দুইটি দেশি হাসনাহেনা, দেশি শিউলী দুইটি, দেশি বিদেশি গন্ধরাজ, সাদা হলুদ দেশি বিদেশি ৪টি কামিনী, দেশি একটি নয়নতারা, একটি বকুল, একটি বিদেশি বেরিকেট জুই, ৩টি বিদেশি এজেনিয়া, দেশি বিদেশি অলকানন্দা ৩টি, দেশি বিদেশি স্থলপদ্ম, ২টি বিদেশি দাঁতরাঙা, দেশি বিদেশি ৩টি টগর, বিদেশি একটি গোল্ডেন সাওয়ার, দেশি বিদেশি ৪টি সিলভার কুইন, একটি বিদেশি হাইডেঞ্জা, বিদেশি একটি পাইথন, বিদেশি সাদা একটি টিকুমা, সিঙ্গেল ও ডাবল জাতের ১২টি এডেনিয়া, দেশি বিদেশি ২টি অপরাজিতা, দেশি বিদেশি বিভিন্ন রঙের ৪টি জারবেরা, একটি দেশি গাঁদা, বিভিন্ন রঙের ৩টি বাগান বিলাস, আকাশি রঙের একটি ক্যামেলিয়া, একটি সাদা রঙের কেতকি, একটি সাদা টিউলিপ, ৩টি টুডে-টুমুর, একটি নাইট কুইন, ৬০টি বিদেশি অর্কিড, বিভিন্ন রঙের ২০০টি ক্যাকটাস।

ঔষধী গাছের মধ্যে রয়েছে, একটি বিলেম্বি, ২টপ গোলমরিচ, দেশি বিদেশি ২টি সাজনা, কারিপাতা, পাথরকুচি, পুদিনা, বকফুল, ৩টি স্টেবিয়া, পানপরাগ, ৪টি অ্যালোভেরা, তুলসি গাছ, ২টি যষ্টিমধু, ৪টি বিদেশি বনসাই, কদম ও পাইন গাছ।

সাবেক ব্যাংকার আব্দুল ওয়াহাব বলেন, কিশোর বয়স থেকেই সখের বশে গাছ লাগাই। তখন থেকেই বাড়ির আঙ্গিনায় আমি বিভিন্ন ফল, ফুল ও ঔষধী গাছের বাগান করতাম। এই কাজগুলো করতে আমার খুব ভালো লাগে।

গাছ বিক্রি করেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশি বিদেশি গাছ সংগ্রহ করা আমার সখ। এগুলো সখের বশেই করেছি, বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য না। তবে দেশজুড়েই নার্সারি মালিকদের কাছে আমি পরিচিত। বিভিন্ন মেলা হলে নার্সারি মালিকরা কিছু কিছু গাছ আমার কাছ থেকে কিনে নেন। এসবের মাঝে অর্কিড ও ক্যাকটাস গাছগুলো খুব কম মূল্যে বিক্রি করি। অনেক সময় পরিচিত কেউ বাগান দেখতে এলে বিনামূল্যে গাছ দিয়ে দিই।

তিনি জানান, ফজরের নামাজ পড়ে ছাদ বাগানের পরিচর্যা করেন দুপুর ১২টা পর্যন্ত। আবার বিকেল থেকে করেন সন্ধ্যার পর পর্যন্ত। তবে যখন ব্যাংকে চাকরি করতেন তখন অফিস থেকে ফিরে রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত এসব গাছের পরিচর্যা করতেন।

গাছ সংগ্রহের বিষয়ে বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকে ব্যাংকে চাকরি করার সুবাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব গাছ সংগ্রহ করেছি। তবে বিদেশি গাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন নার্সারি থেকে সংগ্রহ করেছি। আগে তো গাছের দাম কম ছিল। এখন বিদেশি গাছের দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে এই ছাদবাগানে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন বলে জানান তিনি।

নিজের প্রাপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, আমি শতভাগ সফল। বাগানে এমন সব গাছ আছে যা এই যুগের অনেকেই দেখেনি। যখন কেউ দেখতে আসে আমার খুব ভালো লাগে। পরিশেষে আমি বলতে চাই, পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য রাখতে হলে গাছের প্রয়োজন অপরিহার্য।

এফএ/এমএস