খেলাধুলা

উপমহাদেশের কাবাডি যেভাবে পাড়ি জমালো ইংল্যান্ডে

সিলেটের বিয়ানীবাজারের জাহাঙ্গীর কবির ও সালেহা খান উন্নত জীবনযাপনের লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সেখানেই জন্ম নেওয়া তাদের পুত্র তাহের কবির ইংল্যান্ড জাতীয় কাবাডি দলের অন্যতম সদস্য। ঢাকায় খেলতে এসেছেন দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু কাপ আন্তর্জাতিক কাবাডি টুর্নামেন্ট।

ইংল্যান্ডও কাবাডি খেলে জেনে অনেকেই অবাক হয়েছেন। কাবাডি উপমহাদেশের খেলা। বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে কাবাডি খেলার প্রচুর জনপ্রিয়তা। উপমহাদেশের প্রচলিত এই খেলাটি ইংল্যান্ডেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জনপ্রিয় করছে মূলত উপমহাদেশের মানুষরাই।

যে জাতীয় দলটি ঢাকায় এসেছে সেটি যেন নামেই ইংল্যান্ড। কারণ মাত্র দুইজন ইংরেজ আছেন দলে। বাকিরা বিভিন্ন দেশের বংশোদ্ভূত। বিভিন্ন দেশ বলতে উপমহাদেশেরই বেশি। সর্বাধিক পাঁচজন খেলোয়াড় আছেন ভারতের। একজন করে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকার; আরেকজন হংকংয়ের।

বহুজাতিক এই দল নিয়েই ইংল্যান্ডে কাবাডি খেলার প্রচলন বেশ কয়েকবছর আগে। ইংল্যান্ডের যে দলটি ঢাকায় অংশ নিয়েছে সেই দলের কোচ সঞ্জয় প্যাটেলও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। মঙ্গলবার পল্টনের শহীদ নূর হোসেন ভলিবল স্টেডিয়ামের ভিআইপি গ্যালারিতে বসে তিনিই শোনালেন ইংল্যান্ডে কাবাডি খেলা শুরুর গল্প।

‘আশি-নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের হিন্দু কমিউনিটি নিজেরা কাবাডি খেলতো। এরপর বিভিন্ন সিটির মধ্যে অনুষ্ঠিত হতো কাবাডি টুর্নামেন্ট। এভাবেই ইংল্যান্ডে কাবাডি প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। ২০০৩ সালে গঠিত হয় ইংল্যান্ড কাবাডি অ্যাসোসিয়েশনে। এর সভাপতি অশোক দাস একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তিনি পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন এবং জাতীয় কাবাডি খেলোয়াড়ও ছিলেন’- বলছিলেন ইংল্যান্ড কাবাডি দলের কোচ।

অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পরের বছরই ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ কাবাডিতে অংশ নেয় ইংল্যান্ড। সর্বশেষ ২০১৬ সালে আহমেদাবাদ বিশ্বকাপেও খেলেছে ইংলিশরা। বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে বর্তমানে ইংল্যান্ডের অবস্থান ১৫তম।

বিভিন্ন শহরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে ভারতের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়েই জাতীয় দল গঠন করে দেশটি। ইংল্যান্ডে কাবাডি এখন স্বীকৃত খেলা। ২০০৯ সালে দেশটি নারী কাবাডি দলও গঠিত হয়েছে। সে বছর নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে দেশটির মেয়ে কাবাডি দল প্রথম ম্যাচ খেলে।

ইংল্যান্ড দলের কোচ সঞ্জয় প্যাটেল দেশটির কাবাডি উন্নয়নে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে জানান। নিজের সম্পর্কে সঞ্জয় বলেন, ‘আমার বাবা ষাটের দশকে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। ইংল্যান্ডে জন্ম আমার। ভারতীয় হিসেবে কাবাডির ওপর একটা টান তো আছেই। আমি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের হয়ে তিন বছর কাবাডি খেলেছি। ইংল্যান্ড জাতীয় দলেও খেলেছি দুই বছর। এখন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ।’

সঞ্জয়ের রয়েছে কাবাডির প্রতি অনেক টান। নিজেদের দেশের প্রচলিত খেলা কাবাডি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় বিস্তার ঘটানোটা তিনি দারুণ উপভোগ করছেন বলেই জানালেন, ‘এই ছেলেরা আগে সেভাবে কাবাডি খেলেনি। বিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টেই তাদের হাতেখড়ি। তবে প্রত্যেকের কাবাডির প্রতি ভালোবাসা আছে এবং খেলার প্রতি টান আছে। ওদের আগ্রহ দেখে আমি খুশি। ওদের কাবাডি শেখানোটা আমি দারুণ উপভোগ করছি। জাতীয় দলে খেলবে বলে ওদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল সেটা তারা নিয়েই এসেছে।’

ঢাকায় আসা ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা হচ্ছেন- সোমেশ্বর কালিয়া, যুবরাজ পান্ডিয়া, মিলান কমলেশ নাইয়ি, কেশব গুপ্ত ও বিনয় গুপ্ত। এর মধ্যে কেশব গুপ্ত ও বিনয় গুপ্ত দুই ভাই। এই দলের ক্রিস্টোফার ওয়েলিংটন ও থমাস ডাউট্রেই শুধু ইংলিশ।

খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই পড়াশোনা করছেন। লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ, কিংস কলেজ, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের নিয়েই মূলত গঠিত ইংল্যান্ড জাতীয় দলটি। লেখাপড়ার বাইরে কেউ কেউ খণ্ডকালীন কাজও করে থাকেন। একেকজন একেক জায়গায় থাকেন বলে তাদের জড়ো করে অনুশীলনের সুযোগটাও কম পেয়েছেন কোচ সঞ্জয় প্যাটেল।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কাবাডি খেলে। তবে কোন ক্যাম্পাসেই অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা নেই। কোচ সঞ্জয় প্যাটেল বলছিলেন, ‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের খেলাধুলার বিশাল জায়গা আছে। ফুটবল মাঠ, রাগবি মাঠ, ক্রিকেট পিচ ও টেনিস কোর্ট আছে। ওই ক্যাম্পাসের বেজমেন্টে থাকা কোর্টে ম্যাট বিছিয়ে চলে কাবাডি দলের অনুশীলন। কখনও জুডো ম্যাটে খালি পায়েও অনুশীলন করে খেলোয়াড়েরা।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তাহের কবির কিভাবে কাবাডিতে এলেন? জেনে নেওয়া যাক তার কাছ থেকে। ‘আমি কেসিএল (কিংস কলেজ) কাবাডি টিমের হয়ে খেলা শুরু করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের টুর্নামেন্টে খেলি। আমি তিন বছর ধরে কলেজ টিমের ক্যাপ্টেন। ওখান থেকে আমার উঠে আসা। স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে কোচ আমাকে খুঁজে বের করেন। তারপর ট্রায়াল দিতে বলেন। একদিন কোচ বললেন, বাংলাদেশে টুর্নামেন্ট আছে। তুমি অ্যাভেইলেভল থাকলে আমাদের সঙ্গে আসতে পারো। এভাবেই জাতীয় দলের সদস্য হয়ে গেলাম’- বলছিলেন তাহের কবির।

আরআই/এসএএস/এমএস