শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে স্নাতকোত্তর পাস করা সেই শাহিদা খাতুনের পাশে দাঁড়ালেন বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) সভানেত্রী জীশান মীর্জা। তার উদ্যোগে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান যশোরের নওয়াপাড়াস্থ আকিজ জুট মিলে এক্সিকিউটিভ কর্মকর্তার পদে চাকরি হয়েছে তার।
বুধবার (২৩ মার্চ) দুপুরে শাহিদার বাড়িতে গিয়ে তার হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন জীশান মীর্জা। এ সময় জাগোনিউজ২৪.কম-এ শাহিদাকে নিয়ে করা প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে, শাহিদার পরিচালিত প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের নিয়ে ‘সৃষ্টিশীল নারী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার’ শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি অনেক প্রতিবন্ধী শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর আর কপালে চুম এঁকে দেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের খবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের চকলেট, নতুন পোশাক ও বিভিন্ন উপহারও তুলে দেন জীশান মীর্জা।
দুটি পা ও একটি হাত না থাকা শারীরিক প্রতিবন্ধী শাহিদা খাতুনের বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। মুদি দোকানি রফিউদ্দিনের ছয় সন্তানের মধ্যে শাহিদা চতুর্থ। দুটি পা আর একটি হাত না থাকলেও সচল বাকি হাত দিয়েই বাঁচার স্বপ্ন দেখেন শাহিদা খাতুন। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এলাকায়। জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী তরুণী প্রবল ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে ২০১৫ সালে যশোর সরকারি এম এম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স পাস করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি শাহিদা হ্যান্ডিক্রাফট, সেলাইসহ বিভিন্ন হাতের কাজও করতেন। শাহিদা নিজে প্রতিবন্ধী হয়েও অন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য এগিয়ে যান। বাড়ির পাশে গড়ে তোলেন সৃষ্টিশীল নারী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা। এখানেই প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা আর নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলছেন আত্মকর্মসংস্থান।
এক সময় প্রতিবেশীরা শাহিদার জন্মকে ‘পাপের ফল’ বলতেও কার্পণ্য করেননি। আজ তারা শাহিদাকে মেনে নিয়েছেন বিপদের বন্ধু হিসেবে। যে কোনো দরকারে ছুটে যান তারা শাহিদার কাছে। তার পরও ইচ্ছাশক্তি বলে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ায় হতাশ ছিলেন প্রতিবন্ধকতকা জয় করা শাহিদা।
শাহিদাকে নিয়ে ২০২০ সালের ৬ নভেম্বর দেশের শীর্ষস্থানীয় নিউজপোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কম-এ ‘ঘৃণায় ভরা শাহিদার শৈশব’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর তার স্নাতকোত্তর পাস নিয়ে গতবছরের ১৮ নভেম্বর ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়েছেন শাহিদা’ শিরোনামে আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
শাহিদাকে নিয়ে প্রকাশিত এসব সংবাদ পুনাকের সভানেত্রী জীশান মীর্জার নজরে এলে তার আন্তরিক উদ্যোগে জেলা পুলিশ শাহিদার বিষয়ে খোঁজ শুরু করে। ২২ মার্চ ও ২৩ মার্চ পুলিশ সমাবেশ ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যশোর আসেন পুনাকের সভানেত্রী জীশান মীর্জা। বুধবার জেলা পুনাক নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শাহিদার বাড়িতে গিয়ে তার হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন তিনি।
নিয়োগপত্র পেয়ে খুশিতে আত্মহারা শাহিদা খাতুন। তিনি বলেন, অবশেষে আমার একটা কর্মসংস্থান হলো। পড়াশোনা শেষ হলেও চাকরি না হওয়ায় আমি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। প্রতিবন্ধী হিসেবে বাড়িতে পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে ছিলাম। পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থান না হওয়ায় বোঝাটা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পুনাকের সভানেত্রীর কল্যাণে আমার একটা চাকরি হলো। এখন আমি মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে পারবো। তারা যে আমাকে সীমাহীন শ্রম দিয়েছে, চাকরি হওয়ার ফলে এখন আমি তাদের দুমুঠো ভাত খাওয়াতে পারবো। এটি আমার জীবনে বড় পাওয়া।
শাহিদা আরও বলেন, আমি চাকরিতে যোগ দিলেও আমার হাতে গড়া সৃষ্টিশীল নারী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা চলবে তার নিজস্ব গতিতে। কেন না আমি এখান থেকে সামনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অনেককেই গড়ে তুলেছি।
পুনাকের সভানেত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শাহিদার বাবা রফিউদ্দিন বলেন, শাহিদার জন্মের পর অনেকে কটু কথা বলেছে। অনেকে মেরে ফেলতেও বলেছে। এরপরও অনেক কষ্ট করে বড় করেছি। কত রোদ, বৃষ্টি, ঝড় পার করে আজ সে উচ্চশিক্ষিত। দীর্ঘদিন পর হলেও শাহিদা চাকরি পেয়েছে এটা সমাজের অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। সমাজের আর দশটা প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েও তাকে অনুসরণ করতে পারবে। তারাও পড়াশোনা শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, সমাজের বোঝা হবে না।
এ সময় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) সভানেত্রী জীশান মীর্জা বলেন, ‘জাগোনিউজে শাহিদাকে নিয়ে সংবাদ পড়েছি। তার অদম্য প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অনন্য নজির স্থাপনের বিষয়টি আমাদের ভালো লেগেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পুনাক নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি অসহায় ও দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই ধারাবাহিকতায় শাহিদার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে পুনাক।
তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষিত হয়েও শাহিদা চাকরি পাচ্ছিল না। তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় পরিবারটি এখন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’
মিলন রহমান/এসজে/এএসএম