দেশজুড়ে

সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে ওঠেন রেবেকা

২৩ এপ্রিল বিল্ডিংয়ে ফাটল দেখা দেওয়ায় বিকেলে সবাইকে ছুটি দিয়ে দেন কর্তৃপক্ষ। পরদিন সকালে কাজে গিয়ে বিল্ডিংয়ের ফাটলের কারণে অনীহা প্রকাশ করলে মালিকপক্ষ নানাভাবে হুমকি দিতে শুরু করে। কাজে যোগদান না দিলে বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের কাজের টাকা বন্ধ করে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে। টাকার কথা চিন্তা করে কাজে যোগ দেই। সকাল ৯টায় নাস্তা খাওয়ার কথা জানতে চাইলে মাকে বলি- একটু পরেই খাব। এর কিছুক্ষণ পরেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মায়ের হাতে আনা নাস্তা তো দূরের কথা তিনদিন কোনো খাবার জোটেনি। ভাঙা বিল্ডিংয়ের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলাম। পরে আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান উদ্ধারকারী দল।

কথাগুলো বলছিলেন ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় দুই পা হারানো রেবেকা খাতুন। তিনি দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী।

তিনি বলেন, হাসপাতালে জ্ঞান আসলে জানতে পারি আমার পায়ের উরুর নিচ থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। এরমধ্যে দুই পায়ে আট বার অপারেশন কারা হয়েছে। এক বছর ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কর্মহীন হয়ে গ্রামে ফিরি। শুরু হয় আরেকটি জীবন। এরমধ্যে তার পঙ্গুত্ব জীবন জুড়ে আসে প্রথম সন্তান ছিদরাতুন মুনতাহা (৭) ও দ্বিতীয় সন্তান মাদানি আন নুর (৩)।

তিনি আরও বলেন, সন্তান অন্য বাচ্চাদের মতো আমার কোলে উঠতে চায়; কিন্তু আমি এমনি এক অভাগা মা! পারি না সন্তানদের আদর করে কোলে নিতে, না পারি স্বামী সন্তানের প্রয়োজনে কোনো কাজে আসতে। রানা প্লাজার কথা হয়তো এখন অনেকেই ভুলে যেতে বসেছেন। কিন্তু সেদিনের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা আজো ভুলতে পারিনি। আর কখনো পারবও না। এখনো সেদিনের কথা মনে এলে অতংকে গা শিউরে ওঠে। এ দুর্ঘটনায় আমার শরীরের অপরিহার্য অংশ দুটি পা কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে আমার মা, ফুফু ও দাদীর জীবন।

রেবেকা খাতুন বলেন, সে সময় প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে যা পেয়েছি তা দিয়েই সংসার চলছে। স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান সহযোগিতা করার কারণে বেশির ভাগ সময় বাড়িতে থাকতে হয়। সে কারণে ঠিকমত কাজও করতে পারি না। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে বেসরকারি কিছু সংস্থাও তাদের সহায়তা প্রদান করে। একটি বেসরকারি সংস্থা তার দুটি কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করে দেন। একটি বাড়িও করে দিয়েছেন সে সংস্থা। কিন্তু ওই পা দিয়ে একা একা চলাচল করা সম্ভব না। কিংবা কোথাও গেলে ওই পা লাগিয়ে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন। স্বামী ছাড়া তেমন চলাফেরা বা কোনো কাজ করতে পারি।

আক্ষেপ করে রেবেকা খাতুন বলেন, একজন কর্মক্ষম মানুষ এভাবে চলতে পারে না। পা হারিয়ে আজ কর্মহীন হয়ে সারা দিন বাড়িতে বসে থাকতে হয়।

রেবেকা খাতুনের স্বামী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সেই সময় চিকিৎসাজনিত কারণে ক্ষতি পূরণের জন্য যেখানে ১৫ লাখ টাকা পাওয়া কথা ছিল। সেখানে পেয়েছি ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। বাকি পাঁচ লাখ টাকা এখনো পাইনি।

ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ডাঙ্গা গ্রামের মো. আতাউর রহমানের স্ত্রী ও পৌর শহরের পশ্চিম গৌরীপাড়া গ্রামের আবুল হোসেনের কন্যা গুলশান আক্তার সাবানাও প্রাণ হারান সেদিনের দুর্ঘটনায়। তার মরদেহ খুঁজে পাননি পরিবার।

তার স্বামী মো. আতাউর রহমান ও ছোটো ভাই নাদিম হোসেন জানায়, ওই সময় সেখানেই কাজ করতেন সাবানা। দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে সেখানে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মরদেহ খুঁজে পাইনি। তবে নিখোঁজের তালিকায় তার নাম থাকায় প্রধান মন্ত্রীর তহবিল থেকে ১৩ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি। তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। তারা বাবার কাছেই থাকেন।

এমদাদুল হক মিলন/আরএইচ/এমএস