দেশজুড়ে

ঈদেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না পাবনার তাঁতিরা

করোনা মহামারির পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন পাবনার তাঁতিরা। কিন্তু রং ও সুতার অস্বাভাবিক দামের কারণে তারা পড়েছেন বিপাকে। রমজান মাসে রাত-দিন পরিশ্রম করে শাড়ি-লুঙ্গি তৈরির পর বিক্রি করতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে তাঁতিদের। ফলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। এমন অবস্থায় সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা মুশকিল বলে জানাচ্ছেন তাঁতব্যবসা সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, পাবনার ঈশ্বরদী, সুজানগর, বেড়া ও সাঁথিয়ায় তাঁতের কারখানা মালিক ও শ্রমিকরা দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। বসে নেই নারীরাও। পুরুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নলীভরা, সুতাপারি করা, মাড় দেওয়া ও রং-তুলিতে নকশা আঁকাসহ কাপড় বুননে সহযোগিতা করছেন তারা। এ অঞ্চলের তাঁতপল্লীতে উন্নতমানের জামদানি, সুতি কাতান, সুতি জামদানি, বেনারসি, চোষা ও শেড শাড়ির পাশাপাশি মোটা শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস ও থান কাপড় তৈরি হচ্ছে। বাহারি ডিজাইনের সব শাড়ি-লুঙ্গি তৈরি হলেও হাটে এসে তাঁতিদের আশা ভঙ্গ হচ্ছে।

সপ্তাহে শুক্রবার ও শনিবার পাবনার আতাইকুলায় শতবর্ষী ঐতিহ্যের শাড়ি-লুঙ্গির হাট বসে। আতাইকুলা হাটে সরেজমিনে গেলে তাঁতি, রং, সুতা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।

শনিবার (২৩ এপ্রিল) আতাইকুলায় কাপড় বিক্রি করতে আসা তাঁতি শাহজাদপুরের গোলাম মোর্শেদ বলেন, ১২ হাজার টাকার সুতার দাম হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। কাপড় বুনে বিপাকে পড়েছি। হাটে কাপড় বেচতে পারছি না।

তিনি বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানেন না আমরা কীভাবে চলছি। হাটে কাপড় নিয়ে আসার পর ক্রেতারা দামই জিজ্ঞেস করছে না। এভাবে চলতে থাকলে তাঁতশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

পাবনা সদর উপজেলার গঙ্গারামপুর মহল্লার মিলন হোসেন (৪৮) জানান, একসময় তার আটটি তাঁত ছিল। বাড়িতে শ্রমিক-কর্মচারী ছিল। কিন্তু রং ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি তাঁত বিক্রি করে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এখন অন্যদের কাছ থেকে লুঙ্গি কিনে এনে বিক্রি করে চলেন। তার মহাজনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দেনা ছিল। তিন লাখ টাকা শোধ করতে পেরেছেন। এখনো দুই লাখ টাকা দেনা থাকায় মহাজনের সামনে যেতে লজ্জা পান।

তিনি আরও জানালেন, ঈদের আগে হাটে এসে তার একটি লুঙ্গিও বিক্রি হয়নি। গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাড়ি যাবের সে অবস্থাও নেই। তার দাবি, সরকার চাষিদের যেভাবে সহায়তা করে সেভাবে কার্ডের মাধ্যমে যেন তাদের সহায়তা করা হয়।

হাফিজুর রহমান নামে এক তাঁতি অভিযোগ করে বলেন, তাঁতি সম্প্রদায় বলে কিছু একটা আছে সরকার বোধ হয় তা ভুলেই গেছে। রঙের দাম চারগুণ বেড়ে গেছে। এক তোলা রঙ ৩০ টাকার জায়গায় হয়েছে ১২০ টাকা। ৪ হাজার টাকা পাউন্ডের রঙের দাম হয়েছে ১২ হাজার টাকা। বিভিন্ন রকমের রঙ আছে, সব রঙেরই দাম বেড়েছে । রঙ-সুতার দাম বেড়েই চলেছে, কমার কোনো লক্ষণ নেই। কিন্তু বেচাকেনা কমে গেছে। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী পণ্যের দাম বাড়েনি। খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম রাখা যাচ্ছে না। দাম শুনেই ক্রেতারা চলে যান। ক্রেতারা আগের দামে লুঙ্গি বা কাপড় কিনতে চান।

পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার শিবপুর গ্রামের তাঁতি শামসুর রহমান বলেন, সারাবছর ব্যবসা করি এবং রমজান মাসে আমাদের ঘাটতি পূরণ করব এ আশায় চেয়ে থাকি। কিন্তু এবার সুতা ও রঙের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা লাভের মুখ দেখছি না। এর ওপর মহাজনের কাছে যে ঋণ নিয়েছি তা পরিশোধ করার অবস্থা নেই। রমজান মাসে ব্যবসা তো হলোই না উল্টো বেশি দামে সুতা কিনে কম দামে কাপড় বেচতে হচ্ছে।

বেড়ার তাঁত শ্রমিক আব্দুস ছালাম, আফজাল হোসেন, লোকমান, সালেক, রতন সাহা, রায়হান, গাজীউর রহমান, আব্দুস সালাম, রাঙ্গা, তোরাব আলী ও আব্দুর রহিম জানান, করোনায় দুই বছর কাজ খুব কম ছিল। খেয়ে না খেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে।

তারা জানান, কাজ করে সপ্তাহে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও তাদের মজুরি বাড়েনি। ঈদকে সামনে রেখে পরিবারের চাহিদা মেটাতে তারা বাড়তি রোজগারের আশায় রাত-দিন কাজ করছেন।

পাবনার সুতা ব্যবসায়ী আমিন উদ্দিন বলেন, তাঁতিদের দুর্দিন চলছে। অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি সুবিধাগুলো প্রান্তিক তাঁতির কাছে পৌঁছায় না। যারা পাচ্ছেন তারা উঁচু পর্যায়ের ব্যবসায়ী। সাধারণ তাঁতি সম্প্রদায় কোনো ভর্তুকি পাচ্ছে না। তারা ধীরে ধীরে দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী হয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, গত বছর যে ত্যানা সুতার (৫০ কাউন্ট সুতা) দাম ছিল ১৩ হাজার ৫০০ টাকা সে সুতার দাম হয়েছে ২৪ হাজার টাকা। সে অনুযায়ী তাঁতিরা কিন্তু কাপড়ের দাম বেশি পাচ্ছেন না। এজন্য তাদের মহাজনের কাছে দেনা হয়ে গেছেন। অনেকে দেনার দায়ে পালিয়েও বেড়াচ্ছেন।

সাঁথিয়ায় অবস্থিত তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, পাবনায় প্রায় আড়াই লাখ তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র এক তৃতীয়াংশ। এসব তাঁতশিল্পে প্রায় দেড় লাখ পুরুষ ও নারী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আরও পরোক্ষভাবে ৫ থেকে ৭ লাখ জনবল এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

পাবনা জেলা তাঁতি লীগের সদস্য সচিব সোহরাওয়ার্দী বলেন, রং ও সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে তাঁতিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত। তার ওপর করোনা সংকট ছিল তাদের জীবনে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো।

তিনি আরও বলেন, তাঁতিরা সারা বছরের অর্ধেক ব্যবসা করেন রোজার মাসে। এবার সেটাও হচ্ছে না। এতে করে অনেক তাঁতি পথে বসবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন।

তাঁত বোর্ড পাবনার সুপারভাইজার এবং ভারপ্রাপ্ত লিয়াজো অফিসার শাহজামাল বলেন, তারা পুরো বিষয়টি জানেন। তবে রং-সুতার দাম কমানো-বাড়ানো সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়।

তিনি আরও জানান, তারা তাঁতিদের ওপর সার্ভে করেছেন। তাঁতিদের নানা অভাব-অভিযোগের কথা তাঁত বোর্ডকে জানাবেন।

এমআরআর/জিকেএস