কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি। নিজেরা না খেয়ে তাদের খাইয়েছি। কোলেপিঠে করে বড় করেছি। তাদের সব আবদার পূরণ করেছি। আজ তারাই আমাদের ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
মনে কষ্ট নিয়ে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন ফরিদপুরের বৃদ্ধাশ্রম ‘শান্তিনিবাসের’ বাসিন্দারা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় অবস্থিত শান্তিনিবাসে রয়েছেন ১১ জন নারী ও চারজন পুরুষ।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শান্তিনিবাসের বাসিন্দা ১১ জন নারী-পুরুষের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে থাকা, খাওয়া, চিকিৎসাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন নারী অসুস্থ। তাদের দেখভাল করার জন্য আয়া রয়েছে।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৭৫)। তার ঠাঁই হয়েছে এ শান্তিনিবাসে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘১০ বছর আগে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা চক্রান্ত করে আমার সব সম্পত্তি তাদের নামে করে নেয়। এরপর আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর থেকে নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন স্থানে দিন কাটছিল। পরে ঠাঁই হয় শান্তিনিবাসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখন অসুস্থ। পরিবারের সবার কথা খুব মনে পড়ে; কিন্তু কেউই আমার খোঁজ নেয় না। এখন এই শান্তিনিবাসে পড়ে আছি।’
ফরিদপুর সদরের সাদিপুর এলাকার আয়শা বেগম (৭৪) আক্ষেপ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ স্বামী-সন্তানদের নিয়ে কত আনন্দই না করেছি। সন্তানের চাওয়া পূরণ করেছি। তাদের যাতে কষ্ট না হয়, সে বিষয়ে খেয়াল রেখেছি। ঈদ উৎসবে তাদের বায়না মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আজ আমার ঠাঁই হয়েছে শান্তিনিবাসে। পরিবারের সদস্যরা এখন খোঁজখবর নেয় না।’
হাসিনা বেগমের বাড়ি গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর উপজেলায়। তিনি শান্তিনিবাসে রয়েছেন প্রায় ১০ বছর। দীর্ঘদিন আগে স্বামী আব্দুল জব্বার বিশ্বাস মারা গেছেন। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী। এদের মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে মারা গেছে। আরেক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এরপর মেয়ে তার থাকার শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিয়ে তাকে রাস্তায় বের করে দেন। বিভিন্ন স্থান ঘুরে এক সময় আশ্রয় হয় শান্তিনিবাস।
হাসিনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কতদিন আপনজনের সঙ্গে ঈদ করি না। মাঝে মধ্যে মেয়ের কথা মনে পড়ে। তবে মেয়ে আমার কোনো খোঁজও নেয় না।’
ঈদের সময়ের স্মৃতি মনে করে বারবার কাপড় দিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন আকলিমা আক্তার। বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বামী মারা গেছে ২৫ বছর আগে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। তারা এখন স্বামীর বাড়িতে। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়ে ও দেবর সব সম্পত্তি তাদের নামে লিখে নেয়। এরপর থেকে চার বছর ধরে আছি এখানে।’
সাজ্জাদ হোসেনের বয়স ৬৫ বছর। এখানে রয়েছেন তিন বছর। আগে চাকরি করতেন। স্ত্রী ও ছেলে রয়েছে। চাকরি থেকে অবসরের পর স্ত্রী, ছেলের সঙ্গে অভিমান করে শান্তিনিবাসে চলে আসেন। এখন পরিবারের কেউ তাকে খোঁজ নেন না।
সাজ্জাদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাড়ি, সম্পত্তি সবকিছু পরিবারের সদস্যদের দিয়ে দিয়েছি। এখন শান্তিনিবাসে ভালো আছি। এখানকার সবাইকে আপন করে নিয়েছি। ঈদের আনন্দ এখানকার সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করি।’
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার পৌর সদরের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৬৫)। তিনি খুবই অসুস্থ। কথা বলতে পারেন না ঠিকমতো। খাওয়া-দাওয়া, প্রস্রাব-পায়খানা সবই বিছানায় করতে হয় তাকে।
ভাঙা ভাঙা গলায় রোকেয়া বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার কেউ নেই। স্থানীয়রা তিন বছর আগে আমাকে এখানে রেখে যান। এরপর থেকে এখানেই আছি। এটাই আমার শেষ ঠিকানা।’
শান্তিনিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তাহসিনা জামান জাগো নিউজকে বলেন, শান্তিনিবাসে ১১ জন নারী ও চারজন পুরুষের মধ্যে তিনজন নারী খুবই অসুস্থ। তাদের সুস্থ করতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ঈদ উপলক্ষে সবাইকে নতুন কাপড় দেওয়া হয়েছে। ঈদের দিন সকালে রুটি-সেমাই, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুপুরে ও রাতে পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু এবং খাসির মাংসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।
শান্তিনিবাসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মাদ নূরুল হুদা জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৩ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ শান্তিনিবাস উদ্বোধন করেন। এখানে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। এখানে যারা আছেন আমাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বাত্মক ভালো রাখার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
এন কে বি নয়ন/এসআর/জেআইএম