দেশজুড়ে

চৌফলদন্ডী-খুরুশকুল সেতু বেশি টানে উপকূলীয় পর্যটকদের

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত নগরী কক্সবাজার। এখানে সাগর-পাহাড়ের মিতালির সঙ্গে রয়েছে পাহাড়ঘেরা বদ্বীপ। সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে পাহাড়ের কূল ঘেঁষে তৈরি হয়েছে সুদীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। রয়েছে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। হাতের নাগালে এতকিছু থাকার পরও নানা কারণে অনেক স্থানীয় এসব পর্যটন স্পটের সান্নিধ্য নিতে পারেন না। তাই একঘেয়ে জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ফেরাতে বাড়ির পাশে বিনোদন অনুষঙ্গ আবিষ্কার করছেন ভ্রমণ বিলাসীরা।

কক্সবাজার সদরের উপকূলীয় চৌফলদন্ডী-খুরুশকুল দীর্ঘ সেতুটি উপকূল-সমতলের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার বিনোদন অনুষঙ্গ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। শীতের বিকেল কিংবা ঈদ বা যেকোনো দিবসে এখানেই ঘুরতে আসছেন হাজারো মানুষ।

বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেলের পূর্ব তীর ঘেঁষে উপকূলীয় খুরুশকুল, চৌফলদন্ডী, পোকখালী, গোমাতলীর অবস্থান। এখানকার অধিবাসীরা সব ঋতুতে সাগর থেকে মাছ আহরণ, উপকূলে গ্রীষ্মে লবণ ও বর্ষায় চিংড়ি ঘের করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব পণ্য জাতীয় অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যাবস্থা চরম নাজুক ছিল। এসব এলাকার মানুষকে স্থলপথে সদরে যেতে ৩৫-৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হতো।

কিন্তু চৌফলদন্ডী-খুরুশকুল খালে মাত্র ৩৪৭ দশমিক ৬৪ মিটারের একটি সেতু কক্সবাজার সদরের সঙ্গে উপকূলের মানুষের স্থল যোগাযোগ সহজতর করে কমিয়ে দিয়েছে সড়কের দূরত্বও। রূপকল্প-২০২১ প্রকল্পে ২০১৩ সালে এটি সম্পন্ন হয়। এরপর চালু হওয়া এ সেতু পরিবর্তন এনেছে এতদঞ্চলের জনজীবনে। শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল ধরনের জরুরি প্রয়োজনে এ সড়কই ব্যবহার করছেন উপকূলের ২০ ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ। ব্যস্ত এসব এলাকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো সেতুটিকে বিনোদন অনুষঙ্গ হিসেবেও গড়ে তুলেছেন। প্রতিদিন বিকেলে কমবেশি অনেকে এ সেতুতে এসে সাগরবিধৌত নির্মল হাওয়া খেয়ে, সূর্যাস্ত ও পূর্বপাশের বিস্তৃর্ণ মাঠের নির্মোহতা অবলোকন করে বিমুগ্ধ হচ্ছেন।

ঈদ বা বিশেষ কোনো দিবসে বিনোদন প্রেমীদের উপস্থিতিতে লোকারণ্য হয়ে ওঠে সেতু ও এপাশ-ওপাশ। এখানে ভ্রাম্যমাণ মুখরোচক খাবার ও পণ্যের দোকানও বসেছে বেশ কয়েকটি। ঈদুল ফিতরের দিন থেকে প্রতিদিন বিকেলে সেতুতে এসে আনন্দ উপভোগ করছেন নানা বয়সের মানুষ। আসছেন নারীরাও।

কথা হয় সেতুতে ঘুরতে আসা উপকূলীয় গোমাতলীর আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সারাদেশ থেকেই ঘুরতে আসছেন ভ্রমণ পিয়াসীরা। কিন্তু উপকূলে কর্মজীবী মানুষগুলো হাতের নাগালে পেয়েও চাইলেই সৈকত তীরে যেতে পারেন না, বা যান না। তবে এসব পরিবারের অন্দরমহলের বাসিন্দা বা সন্তানদেরও বিনোদন প্রয়োজন হয়। তাই এতদঞ্চলের মানুষের বিনোদন অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে চৌফলদন্ডী সেতু।

তিনি বলেন, সেতুতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত অবলোকন খুবই উপভোগ্য। এ সময় সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসা নির্মল বাতাস বিমোহিত করে। ইজিবাইক, মোটরসাইকেলসহ ক্ষুদ্র যানে এখানে আসা সহজ হওয়ায় সববয়সী মানুষ এখানে অনায়াসে এসে বিনোদন নিচ্ছেন।

বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরতে আসা নতুন মহাল এলাকার তরুণী সাদিয়া আফরোজ বলেন, কক্সবাজার সৈকতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো আমাদের। কিন্তু সঙ্গে যাওয়ার পুরুষ সঙ্গী না পেয়ে আর সৈকতে বেশি পর্যটক উপস্থিতির খবরে বাড়ির পাশের এ সেতুতে ঘুরতে এসেছি। এখানেও বালিয়াড়ির মতো স্বচ্ছ বাতাস মেলে, তবে ঢেউয়ের গর্জনটা নেই।

প্রবাস ফেরত শাহ আলম সওদাগর বলেন, বিনোদনের সবকিছু আছে। পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে মহেশখালী চ্যানেলের নীল জলরাশি, পূর্বে চৌফলদন্ডী-ভারুয়াখালী খাল-লবণ মাঠ, দক্ষিণে খুরুশকুলের রাস্তারপাড়ার বিশাল ঘের সমেত লবণ মাঠ ও উত্তরে নদীর তীর, সবমিলিয়ে ভালোই লাগে। কিন্তু এ ভালো লাগায় ছেদ ঘটায় রাখাইনদের তৈরি বিশেষ শুটকি নাপ্পি। এর উৎকট গন্ধ এখানে আসা অনেকের সহ্য হয় না।

স্থানীয় সমাজকর্মী শাহিদ মোস্তফা বলেন, কক্সবাজারে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য কৃত্রিম পর্যটন অনুষঙ্গ ঝাউতলার 'ফিস ওয়ার্ল্ড অ্যাকুরিয়াম' ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এদুটি পর্যটন শিল্পে বিনোদনের পাশাপাশি আয়ও বাড়িয়েছে। চৌফলদন্ডী সেতুও আগামী দিনের জন্য প্রকৃতিগত একটি পর্যটন স্পটে রূপ নিতে পারে। পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এতদঞ্চলের লোকজনের কাছে সাফারি পার্কের মতো এটিও (চৌফলদন্ডী সেতু) বিনোদন এবং অর্থনৈতিক চাকা ঘুরানোর উৎস হবে একদিন।

চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামের সঙ্গে পর্যটন নগরীর দূরত্ব কমাতে আনোয়ারা-বাঁশখালী-পোকখালী-চৌফলদন্ডী-খুরুশকুল উপকূলীয় মহাসড়ক হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে চৌফলদন্ডী-খুরুশকুল-ঈদগাঁও সেতু বাস্তবায়ন হয়েছে। সেটি এখন পর্যটন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নজরে আসায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে এটির যত্নে ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, কক্সবাজার পর্যটন জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানে যতটি স্থান পর্যটন স্পট হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে সেসব স্থানে ভ্রমণ পিয়াসীদের নিরাপত্তায় মোতায়েন হবে ট্যুরিস্ট পুলিশ। থানা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করনে আমরা সদা সচেষ্ট।

এফএ/জিকেএস