‘পুলিশের চাকরি ভালো ছিলো না, তাই নেদারল্যান্ডসে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে হোটেল থেকে পালিয়েছেন রাসেল।’ বড় ভাই সুভাষকে ফোন করে এমন কথা জানানোর পর, প্রবাসে থাকা বড় ভাই তাকে বকাঝকা করেন। এতে রাসেল ফোন কেটে দিয়ে বড় ভাইয়ের নম্বর ব্লক করে দেন। এরপর পরিবারের কারো সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি রাসেলের।
ডগ স্কোয়াডের প্রশিক্ষণের জন্য গিয়ে নেদারল্যান্ডসে হোটেল থেকে পালিয়ে যাওয়া পুলিশ কনস্টেবল রাসেল কান্তি দে’র বিষয়ে তার (রাসেলের) বোন কমলা গণমাধ্যমকে এমনটি বলেছেন।
প্রশিক্ষণের জন্য গত ৯ মে নেদারল্যান্ডসে যায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) আট সদস্যের একটি দল। তাদের মধ্যে দুজন দেশে ফেরননি বলে জানিয়ে মিসিং কমপ্লেন লিখেছেন সিএমপি কমিশনার। ২৪ মে দলের ৬ জন দেশে ফিরে আসেন।
না ফেরাদের দু’জনের মাঝে একজন রাসেল চন্দ্র দে। তিনি কক্সবাজার পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পল্লাইন্না কাটা এলাকার লক্ষণ চন্দ্র দে’র ছেলে। তার তিন মাস বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।
মহেশখালী থেকে এসে কক্সবাজার পৌরসভায় একতলা বাড়ি করে লক্ষণ চন্দ্র দে’র পরিবার বাস করছিল। বাসায় থাকেন রাসেলের স্ত্রী পম্পী রাণী, মা রেবা রাণী দে ও বাবা লক্ষণ চন্দ্র দে। পাশের বাড়িতে থাকেন রাসেলের বড় বোন কমলা দে ও তার স্বামী।
রাসেলের বোন কমলা দে বলেন, ২০ মে রাসেল তার স্ত্রী পম্পীর সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলে। স্ত্রীকে সে নানান কসমেটিকস কেনার কথা জানায়। কিন্তু তারপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ২৫ মে পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়, প্রশিক্ষণে যাওয়া টিমের ৬ সদস্য একদিন আগে (২৪ মে) দেশে ফিরেছে। তবে রাসেল নিখোঁজ। বিষয়টি সেদিনই জানানো হয় দুবাই প্রবাসী ভাই সুভাষ চন্দ্রকে।
তিনি আরো জানান, তবে সেদিন অনেক চেষ্টা করেও রাসেলের সঙ্গে সে (সুভাষ) যোগাযোগ করতে পারেনি। পরদিন ২৬ মে রাসেল নিজেই সুভাষকে ফোন করে। ফোনে সে জানায়, ‘পুলিশের চাকরি রাসেলের আর ভালো লাগছে না। তাই সেদেশে (নেদারল্যান্ডস) থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।’ তখন বড় ভাই তাকে বকাঝকা করলে সে ফোন কেটে দিয়ে তার (সুভাষের) নম্বর ব্লক করে দেয়। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
কমলা বলেন, রাসেল ২০১৬ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেয়। ২০২১ সালের জুনে বিয়ে করে। তার সংসারে তিন মাস বয়সী একটি সন্তানও রয়েছে। এখন আমরা নিজেরাই বিপদে পড়ে গেলাম। তাকে বাবা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করিয়ে পুলিশের চাকরিতে দিয়েছিল। সব সুন্দরভাবে চললেও হঠাৎ তার একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সব ওলট-পালট করে দিয়েছে।
রাসেলের মা রেবা রাণী দে সাংবাদিকদের বলেন, তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে রাসেল সবার ছোট। সে কোথায় আমি জানি না। পরিবারের সঙ্গে সে যোগাযোগ করছে না। আমার ছেলেকে আমি কীভাবে পাব আপনারা বলেন।
রোববার কক্সবাজার জেলা পুলিশ রাসেলের পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন। আগে থেকেই রাসেলের স্ত্রী সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
সর্বশেষ আপডেট জানতে মঙ্গলবার (৩১ মে) বিকেল ৪টায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামানের মুঠোফোনে কল করা হয়। রিং হলে কল রিসিভ না করে লাইনটি কেটে দেন তিনি। খুদে বার্তা পাঠানো হলে, তাতে সাড়া দেননি এসপি।
ডগ স্কোয়াডের প্রশিক্ষণ নিতে সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে সিএমপির দলটি যায় নেদারল্যান্ডসে। দলে ছিলেন একজন এসআই (সশস্ত্র), একজন নায়েক এবং পাঁচজন কনস্টেবল।
কনস্টেবল রাসেল ও শাহ আলমের না ফেরার বিষয়য়ে সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) আমির জাফর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার আগের দিন ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে হোটেল থেকে বের হয়ে যান তারা। এরপর থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গীরা কোনো খোঁজ দিতে পারেনি।
তিনি আরো বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের খোঁজ করা হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছায় পালিয়ে গেছেন নাকি কোথাও বিপদে পড়েছেন তা জানা যায়নি। পরিবারের সদস্যরাও তাদের ব্যাপারে জানেন না।
‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ওই দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে’ বলেও সেসময় উল্লেখ করেন আমির জাফর।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম