ইউরিয়া সারের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে এবং চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশে পরিবেশক (ডিলার) পর্যায়ে ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা এবং কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ টাকা করা হয়েছে। সারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে নওগাঁয় খুচরা বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। সারের দাম বাড়ায় ফসল উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৮৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৮৯ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার পাওয়া গেছে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) মাসে পাওয়া গেছে ৬ হাজার ৩২৭ মেট্রিক টন যা চাহিদার তুলনায় কম।
সদর উপজেলার হাঁপানিয়া ইউনিয়নের চকতাতারু গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার সাড়ে ছয় বিঘা ফসলি জমি আছে। এর মধ্যে এক বিঘাতে ঢেঁড়স ও বেগুন এবং ১০ কাঠাতে শাক আছে। বাকি জমিতে আমন ধান লাগিয়েছি। সরকার প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ছয় টাকা বৃদ্ধি করায় বস্তায় বেড়েছে ৩০০ টাকা। আগে ৮০০ টাকা বস্তা ইউরিয়া সার ছিল। এখন তা বেড়ে হবে ১১০০ টাকা।
তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে আমন ধানে দু’দফায় ৩০-৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হয়। এছাড়া সবজিতে ১০-১২ দিন পর পর ইউরিয়া সার দিতে হয়। কৃষি উপকরণসহ সবকিছুর দামই বেড়েছে। এভাবে যদি বাড়তে থাকে কৃষকদের জন্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়বে। কৃষি উপকরণের দাম কমানোর দাবি জানান তিনি।
মঙ্গলবার (২ আগস্ট) দুপুরে শহরের পার-নওগাঁ সারপট্টি এলাকার খুচরা সার ব্যবসায়ী আবু হাসান বলেন, গত তিনদিন থেকে দোকানে ইউরিয়া সার নেই। ক্রেতারা এসে ফিরে যাচ্ছে। সোমবার থেকে সরকার ইউরিয়া সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বুধবার (৩ আগস্ট) সার পাওয়ার কথা। বর্তমানে প্রতিদিন ইউরিয়া সার ৩-৪ বস্তা বিক্রি হচ্ছে। ১৫ দিন আগেও দিনে ১-২ বস্তা সার বিক্রি হয়েছিল। তবে আমন ধান রোপণের কারণে ইউরিয়া সারের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সার কম পাচ্ছি।
বুধবার (৩ আগস্ট) সকালে মান্দা উপজেলার পঞ্চমীতলার খুচরা সার ব্যবসায়ী আফসার হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় ইউরিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। আমার প্রতিদিন সাত-আট বস্তা সার দরকার। তার বিপরীতে ডিলারের কাছ থেকে পাচ্ছি পাঁচ বস্তা। ডিলার পর্যায়ের প্রতি বস্তা ১১০০ টাকা দাম বলা হলেও আমাদের ১২০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে।
তবে মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার দুবলহাটি ইউনিয়নের সার পরিবেশক ওয়াসেফ আলী মোল্লা বলেন, আগস্ট মাসের ইউরিয়া সার বরাদ্দ পেয়েছি ৪৩ মেট্রিক টন। সোমবার টাকা জমা দিয়েছি। মঙ্গলবার সার পাবো। গত জুলাই মাসে বরাদ্দ পেয়েছিলাম ৩৭ মেট্রিক টন। সারের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি ও কৃষক সমিতি নওগাঁ জেলা কমিটির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা বলেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সারাবিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সারের দাম বৃদ্ধি কৃষকদের ওপর এক প্রকার জুলুম বলে মনে করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষি উৎপাদনে কৃষকদের সহযোগিতা করতে সার ও জ্বালানি তেল ডিজেলসহ যত কৃষি উপকরণ রয়েছে সেগুলোতে বেশি পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন। যাতে করে কৃষকরা আবাদ করতে পারে। কৃষি উৎপাদনে কৃষকরা যদি লাভের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে আগামীতে তারা কৃষি উৎপাদন বন্ধ করে ভিন্ন পেশার দিকে ধাবিত হবে। এতে করে কৃষি অর্থনীতি বিপদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, জেলায় বিসিআইসির (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) পরিবেশক (ডিলার) রয়েছে ১২৭ জন। গত অর্থবছরে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া গেছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাৎসরিক চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে জুলাই মাসে পাওয়া গেছে ৬ হাজার ৩২৭ মেট্রিক টন যা চাহিদার তুলনায় কম।
আব্বাস আলী/এমআরআর/জিকেএস