দেশজুড়ে

বৈরী আবহাওয়ায় কৃষকের অবস্থা কাহিল

বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে পাবনার কৃষি কাজে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে খরচ।তবে কৃষি বিভাগ বলছে, চাষিরা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি কাজে এখন রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। যথা সময়ে ধান, পাট, সবজি কিছুই রোপণ করা যায় না। সেচ দিয়ে চাষ করারও উপায় নেই।পানির লেয়ার নিচে নেমে গেছে।আবার লেয়ার থাকলেও সেচ দিয়ে ফসল ফলানোর পর দাম কথ থাকায় খরচ ওঠে না। এরপর শুরু হয় অসময়ের বৃষ্টি। কখনো কখনো অতি বৃষ্টির কারণে ফসল রোপণই সম্ভব হয় না। কিম্বা ক্ষেতে বীজ পচে নষ্ট হয়।

চাষিরা জানান, সাধারণত মৌসুমি বায়ু প্রবাহ শুরু হয় জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে।কিন্তু দেখা যায় আগস্টের শুরু পর্যন্ত পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে না। এতে রোপা আমনের চাষ বিলম্বিত হয়। যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়, তখন হয়। বৃষ্টির যখন দরকার তখন ফসলের মাঠ খরায় পুড়ছে।

পাবনার বিল গ্যারকা পাড়ের চাষি আব্দুর রশিদ (৫৫) জানান, যখন বৃষ্টির দরকার তখন হচ্ছে না। ফলে কৃষক আমন চাষে হিমশিম খাচ্ছি। গত এক দশক ধরে বিষয়টি লক্ষ্য করছি।

সাঁথিয়া উপজেলার পদ্মবিলা গ্রামের চাষি শফিকুল ইসলাম (৪৫) জানান, এবার বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি।বলতে গেলে বিলে পানি নেই।বর্ষা মৌসুম শেষে এ অঞ্চলে পেঁয়াজের ব্যাপক আবাদ হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাতের কারণে পেঁয়াজের রোপণের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে।

ঘঘুদহ বিল পাড়ের কৃষক আব্দুস সাত্তার জানান, বর্ষা মৌসুম শেষে অসময়ের বৃষ্টিতে বিলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জমিতে সহজে ‘জো’( চাষের উপযুক্ত অবস্থা) আসে না। রবি শস্য চাষ বিলম্বিত হয়।এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, আর ফসলের উৎপাদনও কম হয়।

পাবনার আতাইকুলা থানার বামনডাঙ্গা গ্রামের পেঁয়াজ চাষি জসীম উদ্দিন, সাগর হোসেন, কুমিরগাড়ী গ্রামের আ. কুদ্দুস জানান, বিগত কয়েক বছরে পেঁয়াজ আবাদ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, বর্ষার পানি বিলম্বে নামায় পেঁয়াজ বীজ বপনে দেরি হয়। আবার অতি বৃষ্টিতে পেঁয়াজ চারা প্রায় বছরই নষ্ট হচ্ছে।এছাড়া প্রায় বছরই খরার কবলে পড়ে পেঁয়াজ গাছ নষ্ট হয়। সেচ দিয়ে গাছ পরিপুষ্ট করার কিছুদিন পরই শুরু হয় অতিবর্ষণ কিম্বা শিলা বৃষ্টি। ফলে পেঁয়াজের ফলন ও গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।

পেঁয়াজের রাজধানীখ্যাত পাবনার সুজানগরের চাষি আব্দুল খালেক খাঁন জাগো নিউজকে জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকের অবস্থা কাহিল। জমিতে মুড়ি বা মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণ করার পরই শুরু হয় নিম্নচাপ না হয় লঘুচাপ।ফলে টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে চাষির বিরাট ক্ষতি হয়।আবার নতুন করে মুড়ি( রেটুন) পেঁয়াজ লাগাতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে চাষির লাভ থাকছে না।

ঈশ্বরদী উপজেলার বড়ইচড়া গ্রামের খ্যাতিমান সবজি চাষি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ায় সবজি চাষিরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। অতিবৃষ্টিতে সবজি প্লট নষ্ট হয়।আবার অসময়ের ঝড়ো হাওয়ায পেঁপে গাছ বিনষ্ট হয়।আবার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দাম বেশি হলেও চাষিরা লাভবান হতে পারেন না।বিগত কয়েক বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় অনেক সবজি চাষি পথে বসেছেন।

ঈশ্বরদীর ছলিমপুরের দেশখ্যাত কৃষক এবং কৃষিতে এআইপি (এগ্রিকালচারাল ইমপর্টেন্ট পার্সন) আলহাজ শাহজাহান আলী জাগো নিউজকে জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চাষির ক্ষতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কৃষক মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছেন না।কৃষি সংকট কৃষকের জীবনের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।ফসলের জাত, চাষের সময়, সার-বালাইনাশক, ছত্রাক মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগে কৃষিতে আসছে আমূল পরিবর্তন।

তিনি আরও জানান, কৃষির এই দূরবস্থার জন্য দায়ি জলবায়ুর পরিবর্তন। প্রায় মৌসুমেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।

পাবনায় দোতলা কৃষির উদ্ভাবক অধ্যাপক জাফর সাদেক জানান, বিপর্যয়গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এ অঞ্চলের কৃষিতে এক ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে।পানির জন্য ফসল চাষ করা যাচ্ছে না আবার পাকা ফসল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। অসময়ে শীত ও গরমের প্রকোপও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চরগুলোতেও চলছে ভাঙা গড়ার খেলা। এমনও হচ্ছে চরের পাকা ফসল ঘরে তোলার আগেই নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কৃষি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। ফসলের নানা জাত হারিয়ে যাচ্ছে। আবার বহু প্রান্তিক কৃষক নিঃস্ব হয়ে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি বলেন, বাস্তবতার তাগিদেই জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ এবং কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন, সম্প্রসারণ দরকার।চাষির সুবিধার জন্য বাজার ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন করতে হবে।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালক ড. সাইফুল ইসলাম জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তবে চাষিরা আবহাওয়ার সঙ্গে কিভাবে টিকে থাকতে হয় তাও রপ্ত করে ফেলছেন। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সংকেত পেয়ে সাবধান হতে পারছেন। চাষিরা আবহাওয়ার গতিবিধি বুঝেই শস্য রোপণ করতে শুরু করেছেন।জলবায়ু বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেই চাষিরা টিকে আছেন।

এএইচ/জেআইএম