খেলাধুলা

৮৪, ১৩৫, ৫২! বড় ম্যাচেই নিজেকে বারবার প্রমাণ করেন স্টোকস

পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পথে ইংল্যান্ড দলে সবচেয়ে বেশি অবদান কার? চোখ বন্ধ করেই অনেকে বলবেন, বেন স্টোকস। তার ধীরস্থির এবং অসাধারণ ব্যাটিংই ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ধরে রেখে জয়ের পথে নিয়ে যায়।

কিন্তু ম্যাচ শেষে ফাইনাল সেরার পুরস্কারটি উঠলো স্যাম কারানের হাতে। তারও অবদান কম ছিল না। পাকিস্তানকে কম রানে বেধে রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ বোলিং করেছেন। ৪ ওভারে ১২ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট।

ফাইনাল শেষে সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে স্যাম কারান বলেন, ‘এটা আমার প্রাপ্য নয়। বেন স্টোকসের পাওয়া উচিত ছিল। সে অর্ধশতরান করল। এর আগেও কতবার আমাদের এমন ম্যাচ জিতিয়েছে।’ ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জস বাটলার বলেন, ‘সে বড় ম্যাচের ক্রিকেটার। তার বিরাট ইনিংসগুলোর পিছনে রয়েছে অভিজ্ঞতা।’

স্যাম কারান এবং জস বাটলার ঠিকই বলেছেন। সত্যিই স্টোকস বড় ম্যাচের ক্রিকেটার। বার বার এটা প্রমাণ হয়েছে। ট্রফি জয়ের ম্যাচ হলেই স্টোকস যেন বাড়তি তাড়না অনুভব করেন। ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছাড়ার যেন ধণুর্ভঙ্গ পণ করে বসেন তিনি।

রোববার ম্যাচ জেতানো শটটা মিডউইকেটের উপর দিয়ে মেরেই লাফিয়ে উঠলেন ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক। ইংল্যান্ডকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতালেন ৫২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে। জস বাটলার, অ্যালেক্স হেলসদের হারিয়ে ইংল্যান্ড যখন একটু বেকায়দায়, তখন দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন স্টোকস।

ঠান্ডা মাথায়, ধীরে সুস্থে মেলবোর্নের উইকেটে নিজেকে থিতু করলেন। সে সঙ্গে হিসাব কষে এগোতে থাকলেন জয়ের রানের দিকে। ৪৯ বলে ৫২ রানের ইনিংসে তিনি মাত্র একটি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। সঙ্গে পাঁচটি চার। কোনও তাড়াহুড়ো ছিল না ইনিংসটিতে। কাজটা শেষ করেই তবে মাঠ ছাড়লেন।

২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের পেছনেও অনবদ্য ভূমিকা ছিল স্টোকসের। ফাইনালে ৮৪ রানের ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। স্টোকস না থাকলে ম্যাচটি টাই হত না। তার অনেক আগেই শেষ হয়ে যেতো এবং নিউজিল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হতো।

কিন্তু স্টোকসের ব্যাটে লেগে শেষ বলটি চলে গিয়েছিল বাউন্ডারিতে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে যে ওই বাউন্ডারিই বড় ভূমিকা হয়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল ওই একটা বাউন্ডারি। ট্রফি নিয়ে চলে গিয়েছিল স্টোকসের দেশ। যদিও, চলতি বছর ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি।

শুধু সাদা বলে দু’টি বিশ্বকাপ জেতানোর পিছনেই বড় ভূমিকা নেওয়া নয়, স্টোকসের ব্যাট ইংল্যান্ডকে বারবার এমন পরিস্থিতিতে জিতিয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, তার ব্যাটে অ্যাশেজ জয় করেছিল ইংল্যান্ড।

২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৩৫ রানের ইনিংস ভুলতে পারবেন না ইংল্যান্ডের ক্রিকেটপ্রেমীরা। স্টোকসের খেলা দেখে অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়াটসন আফসোস করে বলেছিলেন, ‘সে যদি আমাদের দলে থাকত, ভাল হত।’

দলকে রোববার বিশ্বকাপ জিতিয়ে স্টোকস বলেন, ‘ফাইনালের মতো মঞ্চে রান তাড়া করতে হলে পুরনো সব কথা ভুলে যেতে হয়। ১৩০ রানে পাকিস্তানকে আটকে রাখার পিছনে বোলারদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। শুরুতে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে হারের ধাক্কা ছিল, কিন্তু সেটা মনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যেত না। সেরা দল সব সময় ঘুষি খেয়ে ফিরে আসে। পরের পরীক্ষার জন্য তৈরি হয়। এটা দারুণ একটা সন্ধ্যা ছিল।’

বড় ম্যাচ জেতানোর এই জেদ স্টোকস কোথা থেকে পান? ইংল্যান্ডের জার্সিতে স্টোকসের বার বার ‘বিগ বেন’ হয়ে ওঠার পিছনে অবশ্যই রয়েছে ঘুষি মেরে ফিরে আসার কাহিনি। যে ঘটনা জীবনটাই বদলে দিয়েছে স্টোকসের।

সাল ২০১৭। রেস্তোরাঁর বাইরে মারপিট করে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন স্টোকস। সংবাদমাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। কেউ লিখেছিলেন, ‘মত্ত অবস্থায় মারপিট করেছেন স্টোকস’, কেউ লিখেছিলেন, ‘তাকে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত।’ সবচেয়ে বড় কথা ক্রিকেটের ‘ব্যাড বয়’ আখ্যা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অন্ধকার সময় গ্রাস করেছিল স্টোকসকে। মানসিকভাবে ভেঙেও পড়েছিলেন তিনি।

ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ককে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। নাম ‘বেন স্টোকস: ফিনিক্স ফ্রম দ্য অ্যাশেজ।’ অর্থাৎ ছাই থেকে উঠে আসা আগুনপাখি। সত্যিই তো সব শেষ হয়ে গিয়েছিল স্টোকসের। ক্রিকেট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবসরও নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তার সিদ্ধান্তে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সতীর্থরা। স্টুয়ার্ট ব্রড ভয় পেয়েছিলেন, ‘মনে হয়েছিল হয়তো ওকে আর কোনোদিন ক্রিকেট খেলতে দেখতেই পাব না।’

সেখান থেকে ফিরে এসে ইংল্যান্ড ক্রিকেটের মুকুট পরেছেন। সত্যিই ছাই থেকে উঠে আসা আগুন পাখি। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের আদালত জানায় স্টোকস নির্দোষ। এক সমকামী যুগলের উপর হওয়া হামলার প্রতিবাদে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিলেন স্টোকস। তার মা ডেব স্টোকস বলেন, ‘এ স্বভাব সে বাবার কাছ থেকে পেয়েছে। এমন ঘটনা চোখের সামনে ঘটলে ওর বাবা কখনও মুখ ঘুরিয়ে চলে আসত না।’ সেই বাবাকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন স্টোকস।

বাবার মৃত্যুর পর নিজের মানসিক অবস্থার কথা জানিয়েছিলেন স্টোকস। বলেছিলেন, ‘কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। সব সময় বাবার মৃত্যুর কথা মনে পড়তো। কিছুদিন পর খেলায় ফিরেছি। আগের মতো নিয়মিত না হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয় এখনও। মানসিক স্থিরতা বজায় রাখতে প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া।’

স্টোকস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসেছিলেন। এই ফিরে আসাটাই স্টোকসের অভ্যেস। মাঠেও সেটাই দেখা যায়। বড় ম্যাচ হলেই স্টোকস বাড়তি উদ্দীপনা পান। হয়ে ওঠেন ‘বিগ বেন’।

Ben Stokes is such an incredible player for the big nights. 2019 finals. That must-win game vs Sri Lanka. And tonight at the MCG. #T20WorldCupFinal #EngvPak

— Aakash Chopra (@cricketaakash) November 13, 2022

টুইটারে আকাশ চোপড়া স্টোকসকে নিয়ে লিখেছেন, ‘অসাধারণ রাতের জন্য বেন স্টোকসই সবচেয়ে উপর্যুক্ত খেলোয়াড়। ২০১৯ ফাইনাল, এরপর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অবশ্যই জয়ী এবং আজকের (রোববার) রাতের এমসিজি।’

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার গ্যারি লিনেকার ক্রিকেটও ফলো করেন। স্টোকসকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত লিনেকার টুইটারে লিখেছেন, ‘বড় ম্যাচের জন্য বেন স্টোকসের চেয়ে বড় খেলোয়াড় সম্ভবত পৃথিবীতে আর নেই। তাকে ভালোবাসি।’

There is no better man for the big occasion in World cricket than @benstokes38. Love him.

— Gary Lineker (@GaryLineker) November 13, 2022

আরেকজন টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতির জন্যই সম্ভবত স্টোকসের জন্ম।’

আইএইচএস/