দেশজুড়ে

হারিয়ে গেছে বাইসাইকেলের কাঁসার বেল, চুরিও বন্ধ

যুগের পরিবর্তনে মডেল পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বাইসাইকেলের চাহিদা আজও রয়েছে। সাইকেলের ব্যবহার বাড়লেও বেল বা ঘণ্টা চুরির ঘটনা বন্ধ হয়েছে। হাইস্কুলগুলোতে যা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সাইকেলের বেল শুধু ছিঁচকে চোররা নিতো তা নয়, বন্ধুরাও অনেক সময় মজা করার জন্য লুকিয়ে রাখতো বলে জানান ছাত্রজীবন থেকে সাইকেল ব্যবহারকারীরা। সাইকেল মেকার আর সাইকেল পার্টস বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কাঁসা বা তামার বেলের বদলে টিনের বা স্টিলের বেল বাজারে আসার পর থেকে চুরি বন্ধ হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাইসাইকেলের চাহিদা বেড়েই চলছে। এ ব্যাপারটা মাথায় রেখে কোম্পানিগুলোও বিভিন্ন মডেলের এবং কোয়ালিটির বাইসাইকেল আমদানি করছে। এখন কোর প্রজেক্ট, ভেলস, হিরো, ফনিক্স, স্টার, ফক্সস্টার সাইকেলের চাহিদাই বেশি।

প্রবীণরা জানান, এখন ছোট্ট শিশুদেরও অভিভাবকরা নানা মডেলের সাইকেল কিনে দেন। কিন্তু চার দশক বা পাঁচ দশক আগে এমনটি ছিল না। তখন মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এত ভালো ছিল না, আবার প্রযুক্তিগতভাবেও এত উন্নতি ছিল না। তাই শিশুদের উপযোগী সাইকেল চোখে পড়তো না। তখন ছাত্র ও কর্মজীবী মানুষরাই সাইকেল ব্যবহার করতেন। তাও সব ছাত্রের আবদার পূরণ হতো না। দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটেই তাদের যেত হতো স্কুলে। তারা জানান, অনেকের শৈশব-কৈশোরে সাইকেলের শখ পূরণ হতো না।

সাইকেলের পুরোনো টায়ার বা রিং চালিয়েও অনেকে শখ মেটাত। রিংয়ের দু’পাশ উঁচু থাকে তাই মাঝে নিচু অংশে কাঠি বসিয়ে ঠেলা দিলেই চমৎকার চলতো চাকা। এখনকার শিশুরা আর তা করে না বা করতে হয় না। এখন মেয়েরাও সাইকেল বা মোটরসাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায় কিন্তু আগে এসব কল্পনাও করা যেত না।

এখন কাঁসার বেলের পরিবর্তে ভেঁপুও ব্যবহার হচ্ছে-ছবি জাগো নিউজ

পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার কিছু প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে ষাটের দশকে ছাত্রদের সাইকেলের ব্যবহার সম্বন্ধে জানা যায়। ষাটের দশকের শুরুর দিকে আটঘরিয়া থানায় কোনো হাইস্কুল ছিল না। এলাকার বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ঝরে পড়তো। সচ্ছল আর সচেতন মা-বাবারা তাদের সন্তানদের ১০-১২ কিলোমিটার দূরে ঈশ্বরদী থানার দাশুড়িয়া স্কুলে পড়াতেন। কিছু ছেলে পাবনা শহরে বা আশপাশের গ্রামগুলোতে লজিং থেকে পড়াশোনা করতো। এলাকার অনেক ছেলে ১৫-১৮ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে পাবনা শহরে গিয়ে পড়তো। সে সময়ে হাইস্কুলে পড়া ছাত্রের সংখ্যা এত কম ছিল যে, কোনো গ্রামে ছিল দু-একজন আবার পাঁচ গ্রামে একজনও ছিল না। দূরের কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া যেমন ছিল ঝক্কির তেমনি স্কুলে গিয়ে সাইকেলের বেল (ঘণ্টা) হারিয়ে গেলে তা আরও বড় বিড়ম্বনার ছিল। সে সময় বেল হারানো নিয়ে স্কুলের হেড স্যারের কাছে বিচার যেত। কারণ অনেক সময় ছিঁচকে চোরের বদলে বন্ধুরাও অপকর্মটি করতো। আবার কেউ মজা করে সাইকেলের বেল খুলে লুকিয়ে রাখতো। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মিয়াপুর হাজী জসীম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে এক সময়ে সাইকেলে ঠাসাঠাসি থাকতো। আশপাশের অন্তত অর্ধশত গ্রাম থেকে ছাত্ররা আসতো। কিন্তু এখন ছাত্র-ছাত্রীর তুলনায় সামান্য সাইকেল দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, এখন এক গ্রাম পারি দিলেই আরেক গ্রামে হাইস্কুল। তাই দূরের গ্রাম থেকে সাইকেল চালিয়ে আর শিক্ষার্থীদের আসতে হয় না। এছাড়া আগে কাঁচা রাস্তা থাকায় হাঁটা বা সাইকেল চালানো ছাড়া উপায় ছিল না। এখন গ্রামে গ্রামে রাস্তা পাকা। তাই ভ্যান, অটোভ্যান, রিকশার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। এতে ছাত্র-ছাত্রীরা সহজেই ভ্যানে স্কুলে চলে আসতে পারে।

আতাইকুলা থানার কুমিরগাড়ী গ্রামের স্কুলশিক্ষক কামাল পাশা স্মৃতিচারণ করে জানান, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে সাইকেল চালিয়েছেন। ক্লাস থ্রি থেকে সাইকেল চালিয়েছেন। তিন বছর হলো মোটরসাইকেল কিনেছেন।

তিনি জানান, ছাত্রজীবনে তাদের কাঁচা রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে দূরের গ্রামে ক্লাস করতে হতো। সে সময়ে হিরো কোম্পানির সাইকেল চালাতেন। এখন বিভিন্ন কোম্পানির, ভিন্ন ডিজাইনের সাইকেলে বাজার সয়লাব। এখন ছাত্ররা মোটরসাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসে! তখন একটি সাইকেল পেলেই তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেত।

কামাল পাশা জানান, সাইকেল চালানোর নানা অম্লমধুর স্মৃতি আছে। স্কুলে যখন ক্লাস চলতো তখন সাইকেলের কাঁসার তৈরি বেল চুরি হয়ে যেত। এজন্য তারা প্রায় দিনই স্কুলে গিয়ে সাইকেলের বেলটি খুলে পকেটে রাখতেন। পরে আবার বেল সেট করে বাড়ি ফিরতেন।

সাইকেল পার্টসের দোকান-ছবি জাগো নিউজ

বেড়া উপজেলার কাশীনাথপুর এলাকার বাসিন্দা প্রভাষক মো. সালাহ উদ্দিন জানান, তিনি কয়েক বছর আগেও দেখেছেন কাশীনাথপুর মহিলা কলেজের ছাত্রীরা মোটরসাইকেল চালিয়ে কলেজে আসেন।

তিনি বলেন, আমাদের ছাত্রজীবনেও সে শখ পূরণ হয়নি। একটি সাইকেলই ছিল কত সাধনার। আর সেই সাইকেলের বেল হারিয়ে গেলে মাথা ঠিক থাকতো না।

পাবনার মিয়াপুর হাজী জসীম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে সাইকেল আসা ষষ্ঠ শ্রেণির তামিম হোসেন জানায়, সে সাইকেলে ভেঁপু লাগিয়েছে। এটার দাম খুব কম। তাই চুরিও হয় না। যারা টিনের বা স্টিলের বেল লাগিয়েছে তাদের বেলও চুরি হয় না। বেল চুরি যাওয়ার আসল রহস্যের কথা জানালেন প্রবীণ সাইকেল মেকার ফারুক হোসেন। তিনি জানান, তার বয়স এখন ৭৪-৭৫। তার মেকারির বয়স প্রায় ৬০-৬৫ বছর। নিজের দীর্ঘ জীবনে তিনি নানা রকম সাইকেল দেখেছেন, মেরামত করেছেন।

তিনি জানান, অন্তত তিন-চার দশক আগেও সাইকেলে কাঁসার (তামার) বেল লাগানো হতো। কাঁসার একটি বাটি চুরি করে ছিঁচকে চোরেরা সহজেই একশ টাকায় বিক্রি করতে পারতো।

তিনি আরও জানান, প্রায়ই ছাত্র বা অন্য পেশার সাইকেল চালকরা দোকানে এসে বলতেন, তার সাইকেলের বেল হারিয়ে গেছে। নতুন বেল লাগাতে হবে। নব্বই দশকের পর থেকে যখন ভারতের টিনের বা স্টিলের বেল আসা শুরু হলো তখন থেকে কাঁসার বেল হারিয়ে যেতে থাকলো আর বেল চুরিও বন্ধ হলো।

একই কথা জানান বনগ্রাম বাজারের আরেক সাইকেল মেকার আবুল কাশেম (৫৫)। তিনি জানান, তার দোকানে এখন অনেক অকেজো টিনের বেল পড়ে রয়েছে। সেগুলো ভাঙারির দোকানে বিক্রি করা হয়।

ভেঁপু ও টিনের বেলের কারণে হারিয়েছে কাঁসার বেল-ছবি জাগো নিউজ

সাইকেলের পার্টস বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, তার দোকানে এখন কয়েক ধরনের বেল বিক্রি হয়। তবে কাঁসার বেল আর নেই। অনেকে খুব কম দামি প্লাস্টিকের ভেঁপুও ব্যবহার করেন। ছাত্রজীবনে দেখেছেন অনেকের সাইকেলের বেল হারিয়ে যেতে। তবে এখন সাইকেলে পার্টস বিক্রির দোকান দেওয়ার পর কাঁসার বেলের কোনো প্রচলন আর দেখেননি। এখন টিনের বা স্টিলের বেল বিক্রি হয়।

মিয়াপুর হাজী জসীম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু সাইদ জানান, তিনি এ স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন। তার ছাত্রজীবনে দেখেছেন সহপাঠী ও অন্যান্য ছাত্র এবং অনেক স্যারও সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতেন। তখন ছাত্র সংখ্যা কম ছিল। অথচ এখন ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়লেও সাইকেলের সংখ্যা সে হারে বাড়েনি। এর কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা ভ্যান-রিকশায় সহজেই স্কুলে পৌঁছাতে পারে।

তিনি বলেন, এখন আগের মতো আর সাইকেলের বেল চুরি যায় না। তাই এখন আর কারও স্কুলে এসে বেল খুলে পকেটে রাখতে হয় না। নীরবে-নিভৃতে কাঁসার বেলের ঐতিহ্যটি হারিয়েই গেছে।

এসএইচএস/এএসএম