স্বাস্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি বেশ প্রভাবশালী। আগে প্রতিষ্ঠানটি পরিচিত ছিল পাবলিক হেলথ অব ইংল্যান্ড নামে। প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি হচ্ছে ভেপিং নিয়ে গবেষণা। ধূমপানের বিকল্প বের করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে ভেপিং প্রচলিত সিগারেটের চেয়ে ৯৫ শতাংশ কম ক্ষতিকর। ওই গবেষণা ধরে কাজ করে ধূমপান কমিয়ে এনেছে যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ড। এমনকি এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনও এগোচ্ছে সেই পথে। এসব দেশে ভেপিংয়ের মাধ্যমে ধূমপানের অভ্যাস কমিয়ে আনছে মানুষ।
এমন একটি পরিস্থিতিতে দেশে আইন করে ভেপিং নিষিদ্ধ করার দাবি করছে একাধিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)। সম্প্রতি ধূমপান ও তামাক ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (২০১৩ সালে সংশোধিত) সংশোধনীর খসড়ায় ভেপিং নিষিদ্ধ করা কথাটি রাখা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে সুনির্দিষ্ট গবেষণা ছাড়াই ‘মনগড়া’ তথ্য দিয়ে ভেপিং নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে অবৈধভাবে ভেপিংয়ের বাজার প্রসারিত হবে, সরকার হারাবে রাজস্ব। তাঁদের অভিযোগ, মার্কিন দাতাসংস্থার অনুদানে এসব এনজিও দেশের নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে কোনো যৌক্তিক গবেষণার বরাত ছাড়াই।
এক সময় প্রচুর সিগারেট খেতেন এখন ছেড়েই দিয়েছেন নাফিস ইমরান। প্রায় ৫০ বছর বয়সি এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি ধূমপান করি ত্রিশ বছর ধরে। বারবার ছাড়তে চেয়েছি। পারিনি। তবে ভেপিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কমিয়ে এনেছি। এখন সিগারেট খাই না গত দুই বছর ধরে। বেশ ভালো আছি।’
নাফিসের এভাবে সিগারেট ছাড়ার বিষয়ে চিকিৎসক হলি ফ্যামিলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সাজ্জাদ খান বলেন, ‘আসক্ত মানুষ হুট করে অভ্যাস ছেড়ে দিতে পারে না। ‘কুইটিং টুল’ এর মাধ্যমে আসক্তি ছাড়ানো স্বাস্থ্যসম্মত। ভেপিংয়ে ক্ষতিকর তামাক থাকে না। একই সঙ্গে পোড়ানো হয় না বলে ভেপিংয়ে টার থাকে না। যার কারণে এটা প্রচলিত সিগারেট থেকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর।’
যুক্তরাষ্ট্রর জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ গেল বছরের শুরুতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষণার বরাত দিয়ে বলেছে, ভেপিংয়ের মাধ্যমে প্রচলিত সিগারেটের আসক্তি কাটানো যায়। এমনকি দেশটির ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ভেপিং বাজারজাত করার অনুমতিও দিয়েছে।
দেশটির ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনোমিক রিসার্চ এর মতে মিনিসোটা অঙ্গরাজ্যে ভেপ ব্যবহারের ওপর স্থানীয় সরকার কর্তৃক অতিরিক্ত করারোপ ও বিধিনিষেধের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের ধূমপানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন বিধিনিষেধ না থাকলে প্রায় ৩২,৪০০ মানুষ ধূমপান ছেড়ে দিত।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক নিকোটিন সিস্টেমস ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন’র (বেন্ডস্টা) প্রেসিডেন্ট সুমন জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে ভেপিং নিষিদ্ধ করার যে আইনি উদ্যোগ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়েছে তাতে ধূমপান হ্রাসের বদলে বরং বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা বেশি। কারণ তখন ধূমপায়ীর কাছে আসক্তি কাটানোর জন্য বিকল্প কার্যকর কোনো উপায় থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ভেপিং নিষিদ্ধ করলে কী আদৌ ইতিবাচক কোনো ফলাফল পাওয়া যায়? কম্বোডিয়া, কাতার, জর্ডান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইরাক, ইরান, লেবানন, সিরিয়া, উরুগুয়ে, মিশর, আর্জেন্টিনা ও তুর্কমেনিস্তানে ভেপিংয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অথচ দেশগুলোতে ধূমপানের হার যুক্তরাজ্য কিংবা নিউজিল্যান্ডের তুলনায় বেশি। গবেষণা না দেখিয়ে মনগড়া তথ্য দিয়ে নিজেদের ইস্যু বাস্তবায়ন করলে তো হবে না।
যদিও থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় তামাক কোম্পানির টিওএটি-এর সিংহভাগ মালিকানা রয়েছে সরকারের হাতে। ফলে ফিলিপ মরিস বা অন্য কোনো ব্র্যান্ড যাতে বাজারে ই-সিগারেট নিয়ে আসতে না পারে এইজন্য ভেপিংকে নিষিদ্ধ করেছে বলে জানান সুমন জামান।
‘কোনো বাছবিচার ছাড়া কয়েকটি দেশের অনুসরণে ভেপিং নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হচ্ছে। কিন্তু পর্যালোচনা করা দরকার, ওই দেশগুলোতে ভেপিং নিষিদ্ধে আদৌ কোনো সুফল এসেছে কিনা নাকি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেতিবাচক হয়েছে।’
‘তামাকজাত দ্রব্যের সঙ্গে ভেপিং, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেমকে ভুলভাবে এক কাতারে ফেলা হয়েছে। অথচ এগুলো ধূমপান ও তামাকজাত অন্য পণ্যের আসক্তি কাটাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় বা কুইটিং টুল হিসেবে স্বীকৃত এবং অন্যান্য প্রচলিত তামাকজাত দ্রব্যের থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা।
‘ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির (পাবলিক হেলথ অব ইংল্যান্ড) গবেষণায় বলা হয়েছে, ভেপিং সাধারণ সিগারেটের তুলনায় ৯৫ শতাংশ কম ক্ষতিকর। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসংক্রান্ত কোনো গবেষণা পর্যালোচনা না করে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা না করে ভেপিং নিষিদ্ধের প্রস্তাব করছে বলে বলেন সুমন জামান।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক কনজ্যুমার চয়েস সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের পদ্ধতি অনুসরণ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভেপিংকে উৎসাহিত করা গেলে বাংলাদেশে ৬২ লাখের বেশি ধূমপায়ী প্রচলিত সিগারেট ছেড়ে দেবে।
বেন্ডস্টা জানিয়েছে, ভারতে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভেপিং নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর পরে এসে দেশটির গণমাধ্যমগুলো এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন এবং পূর্ণবিবেচনার দাবি তুলছেন। কারণ, নিষিদ্ধ করার ফলে পুরো ভেপিং বাজারটা কালোবাজারে চলে যায়। নিম্নমানের ও ক্ষতিকর পণ্যে সয়লাব হয় বাজার। ক্রেতাদের বয়স নির্ণয়ের সুযোগও নেই। অপ্রাপ্তবয়স্করাও কোনো ধরনের বাধা ছাড়া কিনতে পারে ভেপিং।
ভারতে ভেপিং নিষিদ্ধ করার পর দেখা গেছে বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটেপ্লেসে ৫০০ রুপি থেকে ৩৫০০ রুপিতে এখনো বেআইনি ভাবে ভেপিং বিক্রি হচ্ছে যার ফলে সরকার হারাচ্ছে মূল্যবান রাজস্ব। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই ভেপিং রাজস্ব আয়ের একটি নতুন খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার ভেপিংয়ের খাত থেকে ২০২১ সালে ৩১০ মিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব আয় করেছে।
বেন্ডস্টার সভাপতি সুমন জামান বলেন, ‘ভারতের মত কালোবাজারি পরিস্থিতি বাংলাদেশেও যদি আসে তাহলে তা হবে দু:খজনক। সরকার অনেক রাজস্ব হারাবে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রণের কারণে থাকবে স্বাস্থ্যঝুঁকি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সমন্বয়ক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হোসেন আলী খোন্দকার বলেন ‘ই-সিগারেটের নিকোটিন তরলীকৃত এবং তা স্বাভাবিক নিকোটিনের তুলনায় আরও বেশি ক্ষতিকর। আমরা ভেপিংকে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছি না।’
জেডএইচ/জেএইচ/এমএস