অবশেষে ৬৮ বছর পর দখলমুক্ত হতে চলেছে বেনাপোলের ঐতিহ্যবাহী হাকর নদী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে নদী খননের কাজ। ভারতের ইছামতী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত প্রবহমান হাকর নদী ১৯৫৫ সালে দু’পাড়ের প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। ভূমি কর্মকর্তাদের সহায়তায় ৬২ সালে হাকর নদী চলে যায় ব্যক্তি মালিকানায়। দীর্ঘ এ সময়ে নদী দখলমুক্ত করার শত চেষ্টা চললেও তা হয়নি। তবে শেষমেশ আলোর মুখ দেখলো বেনাপোলবাসী।
বেনাপোলের ঐতিহ্যবাহী এ হাকর নদী নারায়নপুর থেকে বেনাপোলের সাদীপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার খনন করা হবে। ২২ কিলোমিটার দূরুত্বের বাকি অংশ পরবর্তীতে ধাপে ধাপে খনন করে বিভিন্ন বিলের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজ শুরু করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী খনন চলছে। খনন শুরুর আগে ১৯২৬ সালের রেকর্ড অনুসরণ করা হচ্ছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের ২০০ গজ দূরে হাকর নদীর অবস্থান। বন্দরের পানি নিষ্কাশনের জন্য হাকর নদী খনন করা খুবই জরুরি। ভারতের গঙ্গা, ইছামতি, ফারাক্কা ও কুদলা নদীর সঙ্গে সীমান্তে সংযুক্ত হাকর নদী। আগে এ নদী পথে দু’দেশের মধ্যে চলাচল করত লঞ্চ ও পাল তোলা নৌকা। ভারতের কোলকাতার বনগাঁ, বশিরহাট থেকে বিভিন্ন ধরনের মালামাল নিয়ে বজরা নৌকা ভিড়তো বেনাপোলের এই হাকর নদীতে।
নদীটি ছিল এ অঞ্চলের জেলেদের মাছ শিকারের প্রধান ক্ষেত্র। মৎস্য, কৃষি ও ব্যবসায়ীদের জীবন জীবিকার উৎস ছিল নদীটি। এক পর্যায়ে বিশাল পরিসরে নদীটির দু’পাড়ে গড়ে ওঠে সাদিপুর, নামাজগ্রাম, নারানপুর, ধান্যখোলা, নাভারনসহ অসংখ্য গ্রাম। কালের বিবর্তনে প্রবাহমান নদীটি সরু খালে পরিণত হয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের পর নদী ঘিরে শুরু হয় অপদখল আর কেনাবেচার উৎসব। অনেকেই নদী দখল করে তৈরি করেছেন বড় বড় অট্টালিকা। রাজনৈতিক পালাবদলে এলাকার প্রভাবশালী মহল নদী দখল করে তৈরি করেছে হাজার পুকুর। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে তুলেছে মাছের ঘের। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে জোয়ার ভাটা। বাংলাদেশিদের দেখাদেখি ওপারে ভারতের পেট্রাপোল এলাকায় বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা জাল দলিল করে নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছে পররবর্তীকালে।
কিন্তু বেনাপোল স্থলবন্দরের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নদীটি দখলমুক্ত করার কোনো বিকল্প ছিল না। সম্প্রতি হাকর নদী খনন কাজ শুর হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বেনাপোলবাসী।
শার্শা উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নারায়নপুর থেকে বেনাপোল চেকপোস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ কিলোমিটার নদী দখলমুক্ত করতে সরকার ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। কক্সবাজারের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগামী জুন মাসের মধ্যে খননকাজ সম্পন্ন করবে বলে জানা যায়।
বেনাপোল নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সদস্য আলী কদর সাগর বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদীটি দখলদারদের কারণে নাব্যতা হারিয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর বেনাপোল-শার্শা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। নদী দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময় আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। সরকার খননের উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমরা আনন্দিত।
বেনাপোল পৌরসভার প্রকৌশলী আবু সাইদ বলেন, বেনাপোল পৌরবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবির মুখে হাকর নদী খনন কাজ শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে খনন কাজ শেষ করা হবে। নদীর ধারে গাছ লাগানোসহ ওভারব্রিজ ও পার্ক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সুন্দর ও মনোরম পরিবেশ ফিরে পাবে বেনাপোলবাসী।
তিনি আরও বলেন, এখনও কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়নি। খনন কাজের প্রয়োজনে তা চালানো হবে। অনেকেই জমি রেকর্ড করে নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু নদীটি দখল করে অনেক প্রভাবশালী স্থাপনা তৈরি করেছেন ফলে খনন কাজের সময় তারা বাধা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান জানান, বেনাপোলের নারায়ণপুর থেকে বেনাপোল সাদীপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার খনন করা হবে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৯৪ টাকা। ২২ কিলোমিটার দূরত্বের বাকি অংশ পরবর্তীতে ধাপে ধাপে খনন করে বিভিন্ন বিলের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে।
এ কাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কোনো বাধা আসছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী খনন চলছে। তবে নদী খননের পক্ষে এলাকার ৯৭ শতাংশ মানুষ অবস্থান নিয়েছে।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নারায়ন চন্দ্র পাল বলেন, যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর শার্শা উপজেলার বেনাপোলে হাকর নদীর খনন প্রকল্প শুরু হয়েছে। খনন কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৯৪ টাকা। খনন কাজ শুরু হয়েছে সাদিপুর থেকে নারায়ণপুর পর্যন্ত। যার দৈর্ঘ্য ৫ কিলোমিটার। খনন কাজ শেষে বেনাপোলবাসী বিভিন্নভাবে উপকৃত হবে। যেমন জলবদ্ধতা দূর হবে এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
জামাল হোসেন/এফএ/এএসএম