দেশজুড়ে

ঐতিহ্য টেকাতে খেজুরগুড়ের মেলা

যশোরের যশ, খেজুরের রস। এই জেলার খেজুরগুড়ের ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। সময়ের পরিক্রমায় ভেজাল আর গাছ ও গাছি সংকটে ঐতিহ্য হারানোর উপক্রম এখন। এমন বাস্তবতায় সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।

সোমবার (১৬ জানুয়ারি) যশোরের চৌগাছা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় দু’দিনের খেজুরগুড়ের মেলা। গাছি, ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এই মেলা।

চৌগাছা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা চত্বরে দুই দিনের খেজুরগুড়ের মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় দুইশতাধিক গাছি তাদের উৎপাদিত খেজুরের গুড়, পাটালিসহ খেজুর রস ও গুড় দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পিঠা-পায়েসের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ভেজালমুক্ত গুড় পাটালির চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি। বেশি দামে বিক্রি করতে পেরে খুশি গাছিরাও।

মেলায় খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে প্রতি ভাড় ২০০ টাকা ও গুড় বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে। পাটালি প্রতি কেজি ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মেলায় অংশ নেওয়া সলুয়া গ্রামের গাছি রশিদ শেখ বলেন, আমি ৩৫ বছর ধরে খেজুরগাছ কাটি (রস সংগ্রহ)। এ বছর নিজের তত্ত্বাবধানে ৮০টি খেজুর গাছ কাটছি। গুড় বানাতে যে খরচ হয় সে তুলনায় লাভ হয় না।

পুড়াপাড়া গ্রামের গাছি আব্দুল হামিদ বলেন, আমি ছোট অবস্থায় আমার বাবার সঙ্গে গাছ কেটেছি। ৫০ বছরেরও অধিক সময় হয়ে গেছে। এটা আমার পেশা। তবে আগে যেমন গাছ কাটার প্রতি গাছিদের আগ্রহ ছিলো এখন আর তেমন আগ্রহ নেই। সঠিক মূল্য না পাওয়ায় আর খেজুর গাছের সংকটে এ ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে।

মেলায় এসে ভেজালমুক্ত গুড় কিনতে পেরে খুশি ক্রেতারা। সাহিদুজ্জামান সবুজ নামে একজন ক্রেতা বলেন, প্রথম কোনো গুড়ের মেলা হচ্ছে। এখানে বিশুদ্ধ গুড় পাটালি কিনতে পারছি। আমি খেয়ে দেখেছি, গুড় পাটালির মান খুবই ভালো। প্রতিবছর এই মেলার আয়োজন করলে মানুষের মধ্যে গুড়-পাটালি নিয়ে ভালো ধারণা জন্মাবে।

আরেক ক্রেতা সোলাইমান হোসেন বলেন, ঐতিহ্যবাহী খেজুরগুড় শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই মেলা আয়োজন করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। নির্ভেজাল গুড় কিনতে পেরেছি। খুবই খুশি হয়েছি।

সুখপুকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হবিবর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় গাছিরা বিশুদ্ধ গুড় উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাদের নিয়েই আজকের এই গুড় মেলা।

স্বরুপদাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল কদর বলেন, খেজুর গুড় তৈরি একটি কষ্টসাধ্য কাজ। যা ইতোমধ্যে বিলুপ্তির পথে। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে আমরা কাজ করছি। গাছিরা ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদন করে ভালো দাম পাচ্ছে।

চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা জানান, যশোর জেলা খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত। নানা কারণে খেজুর গাছ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। খেজুর গাছ রক্ষার সঠিক ব্যবস্থা না করলে ভবিষ্যতে জেলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এবং গাছিদের উদ্বুদ্ধ করতে আজকের এই খেজুরগুড়ের মেলার আয়োজন করা হয়েছে। গাছিরাও স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করেছেন।

এ মেলা ঘিরে দুদিনের আয়োজনে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও সেরা গাছিদের পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।

মিলন রহমান/এফএ/এএসএম