সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশন) নির্বাচন ও নেতৃত্ব নিয়ে উত্তেজনা কাটছেই না। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে বার নির্বাচনের ভোট ও ফলাফল ঘোষণা হলেও নতুন করে সরকার সমর্থিত আওয়ামীপন্থি এবং বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আদালত প্রাঙ্গণ। বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের দাবি, গত ১৫ ও ১৬ মার্চ বারে কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনের নামে যা হয়েছে তাতে তাদের ভোট ছিল না।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ইস্যুতে রোববার (২ এপ্রিল) দুপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মিছিল, ধাওয়া, হাতাহাতি, ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এদিন প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে এডহক কমিটি। দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে আগামী জুনে নতুন নির্বাচন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গঠনের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এদিন দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে আওয়ামীপন্থি ও বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। এসময় বিএনপির আইনজীবীরা ডিম নিক্ষেপ করলে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
দুপুরে সরকার সমর্থিত শতাধিক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের সভাপতি ও সম্পাদকের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন। তারা বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ভবনের দ্বিতীয় ও নিচতলায় অডিটোরিয়ামের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরাও সমিতি ভবনের নিচতলায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সম্পাদক প্রার্থী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে শতাধিক আইনজীবী বিক্ষোভ করেন। তারা আওয়ামীপন্থিদের উদ্দেশে ‘ভোট চোর ভোট চোর’ বলে স্লোগান দেন। দুপক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান চলে দুপুর আড়াইটা নাগাদ।
স্লোগানের মধ্যেই এডহক কমিটির মতবিনিময়আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামের সামনে নবগঠিত এডহক কমিটি মতবিনিময় করেন। কমিটির আহ্বায়ক সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মহসিন রশিদ বলেন, দুপুর দুইটায় আইনজীবীদের সঙ্গে অডিটোরিয়ামে আমাদের মতবিনিময় করার কথা ছিল। কিন্তু চর দখলের মতো তারা চারদিকে তালা দিয়ে রেখেছে। এ কারণে আমরা অডিটোরিয়ামের সামনে মতবিনিময় করছি।
তিনি বলেন, আমরা বেলা ১১টায় বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার এম আমির-উল ইসলামের নেতৃত্বে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছি। উনাকে আমরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছি। সেখানে আমরা বলেছি, এই অনির্বাচিত সভাপতি ও সম্পাদকের সঙ্গে আপনি (প্রধান বিচারপতি) কোনো সম্পর্ক রাখবেন না। সভিপতি ও সম্পাদক হিসেবে কোনোভাবেই তাদের আপনি গ্রহণ করবেন না। আমরা সুপ্রিম কোর্ট বার অফিসকেও এটা জানিয়ে দিয়েছি। আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে তা জানিয়েছি।
তিনি বলেন, আমার নেতৃত্বে গঠিত সমিতির এডহক কমিটি সম্পূর্ণ বৈধ। তারা (আওয়ামীপন্থিরা) সমিতির ডিগনিটি নষ্ট করেছেন।
এসময় এডহক কমিটির সদস্য সচিব শাহ আহমেদ বাদল, কমিটির সিনিয়র সদস্য আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন আহমেদসহ অন্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনবার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি এবং নেতৃত্ব নিয়ে সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে গঠিত এডহক কমিটি ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট বারে আর কোনো কমিটি নেই বলে এডহক কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে এডহক কমিটি।
দুপুর আড়াইটায় বার ভবনে ল’ রিপোর্টাস ফোরামের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এডহক কমিটি। সংবাদ সম্মেলনে কমিটির আহ্বায়ক সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মহসিন রশিদ বলেন, বারে যেটা হয়েছে তার নিন্দা জানাই। বিকেল সাড়ে ৩টায় সমিতির দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় দিয়ে তড়িঘড়ি করে কয়েকজন সদস্য নিয়ে দুপুর পৌনে ২টায় হঠাৎ করে সাধারণ সভা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের এমন ঘটনা বার প্রতিষ্ঠার পর কখনো ঘটেনি।
তিনি বলেন, সাধারণ সদস্যদের তলবি সভায় আজকের এই এডহক কমিটি। এই কমিটি ছাড়া বারে বর্তমানে আর কোনো কমিটি নেই।
প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ায় বারের চলমান সমস্যা সমাধানে তিনি উদ্যোগ নিতে পারেন কি না- এ প্রশ্নের জবাবে মহসিন রশিদ বলেন, প্রধান বিচারপতি এতে ইনভলভ হতে পারেন না। এটা আইনজীবীরাই সমাধান করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিটির সদস্য সচিব শাহ আহমেদ বাদল। এসময় কমিটির সিনিয়র সদস্য আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট ড. রফিকুল ইসলাম মেহেদী, অ্যাডভোকেট ড. এম খালেদ আহমেদ, অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, অ্যাডভোকেট এস এম খালেকুজ্জামান, অ্যাডভোকেট মির্জা আল মাহমুদ, অ্যাডভোকেট মো. সাইফুর রহমান, ব্যারিস্টার সরওয়ার হোসেন, অ্যাডভোকেট ড. শামসুল আলম ও অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমরা সবাই জানি এবং প্রত্যক্ষ করেছি গত ১৫, ১৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট বারে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
সংবিধান অনুযায়ী ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে আগামী ১৪ ও ১৫ জুন তারিখে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং বারের সব সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বারের সংবিধানের সব অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং ওই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরই এডহক কমিটির প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। আজকে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার মাধ্যমে এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আমরা পরিষ্কারভাবে বারের সব সদস্যের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য আপনাদের সক্রিয় সমর্থন, সহযোগিতা এবং পরামর্শ একান্তভাবে কাম্য। যদি কোনো সদস্য বা সদস্যরা কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন আমরা বিশ্বাস করি তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য যদি হয় স্বাধীন ও মর্যাদাসম্পন্ন বার প্রতিষ্ঠা তবে মতান্তরের কোনো প্রশ্নই নেই।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ১৫ ও ১৬ মার্চ নির্বাচনের নামে যা হয়েছে তা পুলিশি তাণ্ডব, কিছু সংখ্যক আইনজীবীর চরম অসভ্যতা। নির্বাচনের নামে বারের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছে। পুলিশি তাণ্ডবে শুধু বারের সদস্যরাই নন, বেশ কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধুও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। এ প্রসঙ্গে বারের কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি হিসেবে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, বেশ কিছুদিন ধরে বারে একটি অশুভ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হচ্ছে বারের সদস্যদের শারীরিকভাবে নাজেহাল করা, কক্ষ ভাঙচুর এবং বার প্রাঙ্গণে সদস্যদের নামে অশোভন স্লোগান দেওয়া।
সেখানে বলা হয়, এ ধরনের কার্যক্রম অনাকাঙ্ক্ষিত, অগ্রহণযোগ্য এবং সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালতের আইনজীবীদের জন্য চরম লজ্জার। আমরা শুধু এসব ঘটনার নিন্দাই নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে জড়িত না হতে বার সদস্যদের আহ্বান জানাই। বার এ ধরনের কার্যক্রম কোনোভাবেই সহ্য করবে না। যদি কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হন তার বিরুদ্ধে বারের সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ৩১ মার্চ বিদায়ী কার্যকরী কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ (৩) (ধ) অনুযায়ী বারের সদস্যরা নির্ধারিত সংখ্যক আইনজীবীদের স্বাক্ষরে সাবেক সম্পাদক আব্দুন নূর দুলালকে চিঠি দেন এবং বার অফিস ২২ মার্চ তা গ্রহণ করে।
গত ৩০ মার্চ সমিতির সাধারণ সদস্যদের এক তলবি সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, ১৫-১৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ মহসিন রশিদকে আহ্বায়ক এবং আইনজীবী শাহ্ আহমেদ বাদলকে সদস্য সচিব করে সুপ্রিম কোর্ট বারে ১৪ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠন করা হয়।
এর আগে গত ১৫ ও ১৬ মার্চ হট্টগোল, হামলা, ভাঙচুরের মতো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুদিনব্যাপী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ঘোষিত ফলাফলে ১৪টি পদের সবকটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি, তারা এ নির্বাচনে ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
এফএইচ/একেআর/জিকেএস