দেশজুড়ে

ডিজিটাল হয়ে ফিরলো ঢেঁকি

আধুনিক যন্ত্র সম্বলিত রাইসমিলের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। কালের আবর্তে যেন যাদুঘরে ঠাঁই নেওয়ার উপক্রম ঢেঁকির। যন্ত্রের ছোঁয়ায় সেই ঢেঁকিকেই ফিরিয়ে এনেছেন যশোর সদর উপজেলার পশ্চিম চাঁদপাড়ার যুবক মাহাবুবুর রহমান। বৈদ্যুতিক যন্ত্র সংযুক্ত করে তৈরি করেছেন ‘ডিজিটাল ঢেঁকি’।

পায়ের সাহায্য বা কায়িক পরিশ্রম ছাড়াই এই ঢেঁকি উঠছে, নামছে। ভানছে ধান, গুঁড়া করছে চাল। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া এই যান্ত্রিক ঢেঁকি দেখতে যেমন ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ, তেমনি লাইন দিয়ে ধান ভানা হচ্ছে, করা হচ্ছে চালের গুঁড়া। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়; বিগত শতাব্দি জুড়েই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ছিল ঢেঁকি। গ্রামগঞ্জের সর্বত্রই ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল তৈরি করা হতো। পিঠা পায়েসের জন্য করা হতো চালের গুঁড়া। চালকল আবিস্কার হলেও ঢেঁকিছাঁটা চালের আলাদা মর্যাদা ছিল। কারণ ঢেঁকিছাঁটা চালের রয়েছে আলাদ পুষ্টিগুণ।

কিন্তু কায়িক পরিশ্রমের কারণে সেই ঢেঁকিকে আর ধরে রাখা যায়নি। কালের আবর্তে এখন আর ঢেঁকি দেখতে পাওয়া যায় না। ফলে ঢেঁকির সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেই ঢেঁকিছাঁটা চাল।

বিষয়টি নাড়া দেয় যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের পশ্চিম চাঁদপাড়ার যুবক মাহাবুবুর রহমানের মনে। শৈশবে কাঠমিস্ত্রির পেশায় যুক্ত মাহাবুব ভাবতে থাকেন কোন প্রক্রিয়ায় কায়িক শ্রমকে বাদ দিয়ে ঢেঁকি চালানো যাবে। আর তা থেকে পাওয়া যাবে ঢেঁকিছাঁটা চাল আর গুঁড়া। সেই ভাবনা থেকে মাহাবুব উদ্ভাবন করেন ‘বৈদ্যুতিক ঢেঁকির’। যা এলাকায় এখন ‘ডিজিটাল ঢেঁকি’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।

আগেকার ঢেঁকির গোড়ায় বা পা’দানিতে ক্রমাগত চাপ দিয়ে ওঠা-নামা করানো হতো, আর আগ্রভাগে লাগানো মুষলের আঘাতে গর্তের শস্য ভাঙা হতো। মাহাবুবের বৈদ্যুতিক ঢেঁকির পা’দানিতে চাপ দেওয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে বৈদ্যুতিক মোটর। মোটরচালিত লোহার হাতল পালাক্রমে চাপ দিয়ে যাচ্ছে দু’টি ঢেঁকির পা’দানিতে। এতেই ওঠা নামা করছে ঢেঁকি। আর মুষলের আঘাতে তুষ ছাড়িয়ে বের হয়ে আসছে ধান; গুঁড়া হচ্ছে চাল। ফলে কায়িক শ্রমকে ছেঁটে ফেলে তৈরি হয়েছে আধুনিক ঢেঁকি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চাঁদপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মনিরুজ্জামান বলেন, আগে পায়ের ঢেঁকিতে ধান কুটতে মা-খালাদের অনেক কষ্ট হতো। এখন মাহাবুবুর রহমানের এই মেশিনের ঢেঁকিতে সহজেই ধান-চাল করা যাচ্ছে। এজন্য দূর-দূরান্ত থেকে তার ঢেঁকিতে মানুষ চাল করতে আসছেন।

সামাজিক সংগঠন বনিফেস’র পরিচালক বেলাল হোসেন বনি জানান, বৈদ্যুতিক ঢেঁকিটি দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মাহবুবুর রহমান ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনেছেন। আগে ঢেঁকিতে নারীদের অনেক কষ্ট হতো। এই প্রযুক্তির কারণে সহজেই ঢেঁকি ছাঁটা চাল পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের উদ্যোগ এগিয়ে নিলে যেমন ঢেঁকিছাঁটা চাল মিলবে; তেমনি ঐতিহ্যের পিঠাপুলিতেও মিলবে হারানো স্বাদ-গন্ধ।

পশ্চিম চাঁদপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহিনা খাতুন জানান, এই ঢেঁকি পায়েচালিত ঢেঁকির চেয়ে ভালো। আমি নিজে সেখান থেকে চালের গুঁড়া করে নিয়েছি। সেই গুড়া থেকে অনেক ভালো পিঠা হয়েছে। নিজ গ্রামে এরকম সুবিধা পাওয়ায় নারীরা দলে দলে চালের গুঁড়া করতে আসছেন।

বৈদ্যুতিক ঢেঁকির উদ্ভাবক মাহাবুবুর রহমান জানান, তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শৈশবেই যুক্ত হন কাঠমিস্ত্রির পেশায়। একসময় তৈরি করতেন পায়ে চালানো ঢেঁকি। কিন্তু চালকলের চাপে ঢেঁকি বিদায় নেওয়ায় ভাবতে থাকেন কিভাবে তা ফিরিয়ে আনা যায়। গত তিনবছর ধরেই তিনি এই বৈদ্যুতিক ঢেঁকি উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গত ৬-৭ মাস আগে এটি দাঁড় করাতে পেরেছেন। এখন বিদ্যুতের সুইচ অন করলেই চলছে ঢেঁকি।

তিনি এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক হলেও নিজেই ঢেঁকিতে ধান থেকে চাল করতে শ্রম দিচ্ছেন। একাজে তার স্ত্রী শাপলা খাতুন ও বৃদ্ধা মা সালেহা খাতুন সহযোগিতা করে থাকেন। এই ঢেঁকির মাধ্যমে দিনে ৫-৬ মণ ধান এবং ১০০ কেজি চাল থেকে গুঁড়া করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

মাহবুবুর রহমান আরও জানান, এই ঢেঁকি তৈরি করতে তার সোয়া দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এটি বানাতে গিয়ে তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েছেন। সরকারি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা পেলে তিনি এটিকে আরও ভালো করে নির্মাণের পাশাপাশি আরও বেশি ঢেঁকি তৈরি করতে পারবেন। এ ব্যাপারে ফতেপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ সোহরাব হোসেন বলেন, ঢেঁকির জায়গা দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন চালকল ও অটোরাইস মিল। এজন্য ঢেঁকিছাঁটা চাল পাওয়াই যায় না। মাহাবুবুর নিজ চেষ্টায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল ঢেঁকি করেছেন। এলাকার মানুষ পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল পাচ্ছেন। তিনি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।

পুষ্টিবিদদের মতে, কলে ভাঙানো চাল মসৃণ করতে গিয়ে অতিপ্রয়োজনীয় কিছু উপাদান বাদ পড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি, খনিজ লবণ, বায়োটিন, আমিষ, চর্বি, ফাইটো কেমিক্যাল ও ফাইবার। আরও চলে যায় আয়রন, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন এ এবং ই। কিন্তু ঢেঁকিছাঁটা চালে এসবের ঘাটতি হয় না। এছাড়া ঢেঁকিছাঁটা চালে সেলেনিয়াম নামের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিদ্যমান, যা হৃদরোগ, ক্যানসার ও বাতের ঝুঁকি কমায়। ফলে তারাও ঢেঁকিছাঁটা চালে ফেরার পরামর্শ দিচ্ছেন।

মিলন রহমান/এফএ/জিকেএস