১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ভয়াল আতঙ্কের রাত। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো সেই স্মৃতি অন্তর থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। সে রাতে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত করেছিল। প্রায় ২০ ফুট জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা। ওই এক রাতেই প্রাণ হারিয়েছিল এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ। সর্বস্ব হারিয়েছিল প্রায় এক কোটি মানুষ।
সেসময় কেউ হারিয়েছিল বাবা, কেউ মা, কেউ আদরের সন্তান। ভয়াল সে ঝড়ে দুই ভাইকে হারানো বাঁশখালীর বাসিন্দা সোহেল সরওয়ার এখনো আতকে ওঠেন সেই রাতের কথা ভেবে। মায়ের হাত ধরে রাতভর পানির তোড়ে ভেসে যেতে যেতে ভোর হতেই আছড়ে পড়েন প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের অচেনা এলাকায়। তখনো মায়ের মুখে জামার বোতামবন্দি হয়ে আটকে ছিল ছোট ভাইটির মরদেহ। যেই স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের। সেই ভয়ে বাড়িছাড়া সোহেল এখনো গ্রামে যেতে চান না। ভুলে থাকতে চান নিজের জন্মস্থলকেও। কিন্তু চাইলেই কি ভুলে যাওয়া যায়? জাগো নিউজকে সেই ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছেন সোহেল সরওয়ার।
সোহেল চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের বাসিন্দা। তারা চার ভাই। সোহেল সবার বড়। ১৯৯১ সালের ওই সময়ে তার বয়স ছিল সাত বছরের মতো। তার দেড় বছরের ছোট রাসেল, তার চেয়ে ছোট সুমন। সবার ছোট শাহেদ ছিল মায়ের কোলে।
স্মৃতিকাতর কণ্ঠে সোহেল বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল আমাদের গ্রামে মাদরাসার বার্ষিক সভা ছিল। সভা উপলক্ষে গ্রামে মেলা বসতো। ওই দিন আমরা মেলায় ছোট ভাইদের নিয়ে অনেক আনন্দ করেছি। নাগরদোলায় চড়েছি। কিন্তু রাতের সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সব আনন্দ মিলিয়ে গেছে। ছোট ভাই সুমনকে ওই রাতে আমরা হারিয়েছিলাম, যার খোঁজ আর কখনো পাইনি। সে জীবিত নাকি ওই সময়ে মারা গেছে জানি না।
সোহেল বলেন, রাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে আমরা চার ভাই ঘুমাতে যাই। ওই সময় ঘূর্ণিঝড় হওয়ার কথা অনেকের মুখে শোনা গিয়েছিল। তবে গ্রামে এর প্রভাব ছিল না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুফান শুরু হয়। একসময় বাতাসের তোড়ে আমাদের কাচারিঘরের কাঠের দরজা ভেঙে পড়ে। আমরা ঘরের ভেতর আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমাদের বসতঘরটি ছিল মাটির, দাদার আমলের তৈরি। রাত গভীর হলে বাবা ঘর থেকে একটু বের হয়ে দেখেন বাড়ির উঠানে পানি চলে এসেছে। তখন পানি হাঁটু পর্যন্ত হয়ে যাওয়ায় বাবা মাকে বলেন, ‘চলো আমরা বেরিয়ে যাই’। আমরা বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়েছি। তখন আমার হাঁটুপানি ছিল। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়ে বাতাসের মধ্যে দেখতে দেখতে পানি বাড়তে থাকে। প্রচণ্ড বাতাসে বিভিন্ন দিক থেকে গাছের ডালপালা ভেঙে আমাদের শরীরের ওপর পড়ছিল। কিন্তু আমরা তেমন আঘাত পাইনি।
এসময় পানি গলা পর্যন্ত হয়ে যায়। তখন বাবা সুমনকে কোলে নেয়। শাহেদ ছিল মায়ের কোলে। রাসেল আর আমি মাকে ধরেছিলাম। এসময় পানির ঢেউয়ে বাবা সুমনকে নিয়ে আমাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। আমরা পানিতে ভেসে আসা একটি ঘরের ছাউনিতে উঠি। অনেক মানুষের কারণে সেই ছাউনিও ভেসে যায়। ঝড়ের তীব্রতার কারণে আমরা বারবার মাকে চেপে ধরছিলাম। এসময় পানির প্রবল স্রোতে সাঁতরাতে কষ্ট হওয়ার কারণে মা তার পরনের শাড়ি খুলে পানিতে ছেড়ে দেন। আমরা বারবার চেপে ধরার একপর্যায়ে মা পানির মধ্যে ছোট ভাই শাহেদের পরনের শার্টের বোতাম কামড়ে ধরেন আর আমাদের দুই ভাইকে দুই হাতে ধরেন। এভাবে ভোর হতে হতে অনেক দূরের এক জায়গায় আছড়ে পড়ি। খুব সম্ভবত ছয় থেকে সাত কিলোমিটার দূরে চলে যাই। তখন পানি কমে গেছে। তখনো মায়ের মুখে নিথর শাহেদের জামার বোতাম আটকে ছিল। মায়ের মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় কয়েকজন বেঁচে যাওয়া মানুষ মায়ের শক্ত চোয়াল টেনে জামার বোতামটি বের করতে পেরেছিলেন। ওই ঘটনায় মা অনেকদিন ট্রমায় ছিলেন। মুখের চোয়ালটিও স্বাভাবিক হতে অনেকদিন লেগেছিল। তবে ওই সকালে মা বলেছেন, শাহেদ যখন মারা যাচ্ছিল, তখন মায়ের বুকে জোরে জোরে লাথি মারছিল। মা বলেন, তখন আমি বুঝতে পারছিলাম শাহেদ মারা যাচ্ছিল।
মূলত আমরা দুই ভাই দুই হাত ধরেছিলাম বলে মা শাহেদকে ধরতে পারছিলেন না। মুখে জামার বোতামের সঙ্গে চেপে ধরেছিলেন। এত ক্ষিপ্রভাবে ধরেছিলেন, প্রবল পানির তোড়েও মুখ থেকে জামার বোতামটি বের হতে পারেনি। আমরা পরে শাহেদের মরদেহ দাফন করি।
সকালে দেখি চারদিকে লাশ আর লাশ। মানুষের লাশ, গরু-ছাগলের লাশ একত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। যতটুকু মনে পড়ে, এর প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা পর আমরা বাবাকে খুঁজে পাই। বাবাও আমাদের খুঁজছিলেন। বাবা জানান, পানির প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণিতে হাতছাড়া হয়ে যায় ছোট (তৃতীয়) ভাই সুমন। এরপর থেকে তার আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
সোহেল বলেন, এখনো আমাদের সেই স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায়। যেহেতু আমি সবার বড় ছিলাম, আমার কিছু স্মৃতি এখনো মনে রয়েছে। ওই ভয়েই আমরা এরপর গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসি। সেই থেকে আর গ্রামে যাওয়ার তাগিদ বোধ করিনি।
সেই সোহেল সরওয়ার এখন একজন নামকরা অ্যাথলেট ও সাংবাদিক। অ্যাথলেট হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক ইভেন্টে জয়ী হয়েছেন। ২০০৪ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ইয়ুথ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাথলেটে ৮০০ মিটারে স্বর্ণপদক জেতেন। একই প্রতিযোগিতায় ১৫শ মিটারে তাম্রপদক জয়ী হন সোহেল। পেশাগত জীবনে ফটোসাংবাদিকতা করেন সোহেল। বর্তমানে অনলাইন পোর্টাল বাংলানিউজ২৪ডটকমের চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসে কর্মরত রয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন।
এমডিআইএইচ/কেএএ