অর্থনীতি

১১ মাস পেরোলেও প্রকাশ হয়নি বিপিসির বার্ষিক প্রতিবেদন

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিগত অর্থবছরের (২০২১-২২) বার্ষিক প্রতিবেদন ১১ মাসেও প্রকাশিত হয়নি। এতে দেশের পেট্রোলিয়াম জ্বালানি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রতিবেদন ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রকাশ হয়েছিল। তবে বিপিসির সচিব বলছেন, কমিটি দফায় দফায় মিটিং করায় সময় বেশি লেগেছে। প্রতিবেদন শিগগির প্রকাশ হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। আর আমাদের দেশে জ্বালানি খাত হচ্ছে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে চুরি। এখানে নিয়োজিত কর্মকর্তারা মনে করেন বিপিসি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। তাদের নামে লিখে দিলেও তারা সন্তুষ্ট হবেন না। আরও খাই খাই করবেন।

আরও পড়ুন>> এনবিআরে বিপিসির বকেয়া জেনে ‘অবাক’ আইএমএফ 

তিনি বলেন, বার্ষিক প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি-অনিয়ম করতে পারে। তারপরেও মানুষের জবাবদিহির একটি জায়গা রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিকসহ সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। পরবর্তী বছরের ১১ মাসের মধ্যেও তারা রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারছে না। একটি আর্থিক বছরের ১১ মাস পরেও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে না পারাটা দুঃখজনক।

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিপিসি জিটুজি মেয়াদি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সাতটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। পাশাপাশি সৌদি আরবের সৌদি আরামকো থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৬৭ মেট্রিক টন মারবান ক্রুড এবং ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৬ মেট্রিক টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল আমদানি করেছে। এতে ব্যয় ছিল ৫৮৪ দশমিক ৬৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আরও পড়ুন>> আলোর মুখ দেখছে ইস্টার্ন রিফাইনারির ২য় ইউনিট, খরচ ২৩ হাজার কোটি 

পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৩৩৪ মেট্রিক টন গ্যাস কনডেনসেট নিয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি ও ফ্রাকশনেসন প্ল্যান্টগুলোতে এসব কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে ১৫ লাখ ৬ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রকারের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৬২ মেট্রিক টন। এসব আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৫৭৯ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

পরিবেশ দূষণ কমাতে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) রেগুলেশন অনুযায়ী সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য লো সালফার (শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) আমদানি শুরু করে ২০২০-২১ অর্থবছরে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসি ৪৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকার পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি করেছে। এতে বিভিন্ন শুল্ক, কর, ভ্যাট, লভ্যাংশ ও উদ্বৃত্ত অর্থ খাতে ১৫ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে বিপিসি।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৬ সালে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা ছিল ১১ লাখ মেট্রিক টন। ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রাক্কলিত চাহিদা দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৭৩ লাখ মেট্রিক টনে। দেশে ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ লাখ মেট্রিক টন। জ্বালানি তেলে ৬২ দশমিক ৯২ শতাংশ যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে, ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ কৃষি খাতে, ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ শিল্প খাতে, ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে, ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ গৃহস্থালি খাতে এবং ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ অন্য খাতে ব্যবহার হয়েছে।

আরও পড়ুন>> ঝুঁকিতে পড়বে পেট্রোলিয়ামসহ জ্বালানি নিরাপত্তা 

ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে ৭২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ডিজেল, ৬ দশমিক ০১ শতাংশ পেট্রোল, ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ অকটেন, ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ১ দশমিক ৬২ শতাংশ কেরোসিন, ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ জেট ফুয়েল এবং ১ দশমিক ৯২ শতাংশ অন্য তেল রয়েছে। ব্যবহৃত জ্বালানির ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে এবং ৯২ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বিপিসি।

ওই অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, বিপিসিতে তেল সরবরাহের জন্য প্রধান স্থাপনাসহ ১১টি নৌ-ভিত্তিক ডিপো, সাতটি রেলহেড ডিপো, দুটি বার্জ ডিপো, একটি গ্যাস ফিল্ডস সংলগ্ন ডিপো এবং তিনটি অ্যাভিয়েশন ডিপোসহ মোট ২৪টি ডিপো রয়েছে। সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমে প্রায় ৫০ হাজার জনবল প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত রয়েছে।

বিপিসির সচিব মুহম্মদ আশরাফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রিন্ট করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত মাসের (এপ্রিল) শেষ দিকে আমাদের মিটিং হয়েছে। মূলত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য কমিটি রয়েছে। কমিটি দফায় দফায় মিটিং করেছে, কমিটি প্রতিবেদনে কিছু রিভাইজড দিয়েছে। এগুলোতে একটু সময় লেগেছে। তারপরেও প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখার জন্য চেয়ারম্যান স্যার সময় নিয়েছেন। আশা করছি চলতি মাসের মধ্যে হয়তো প্রিন্ট সম্পন্ন হবে।

এমডিআইএইচ/এএসএ/জিকেএস