ডিজিটাল হচ্ছে দেশ, এটা জেনে ও শুনে এবং সরকারের রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনে, বিভিন্ন লেখকের লেখা পড়ে, আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের দেশটি সত্যি সত্যিই ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। আর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না আমাদের শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি। উন্নয়নের যে জোয়ার এর মধ্যেই আমরা বিভিন্নজনের অডিও-ভিডিওতে কাল্পনিক ইমেজের উন্নয়নের রূপরেখা দেখলাম, তাতে অভিভূত না হলে বুঝতে হবে, তার মধ্যে মানবিক ও স্পর্শকারতা নেই।
মানবিক মানুষ হিসেবে আমিও অভিভূত হলাম। কিন্তু যেইমাত্র (যখন) তড়িতাহত হলাম বিদ্যুৎ চলে গেলো, তখনই মনের অন্ধকার কোণে আলো জ্বলে উঠলো- পাওয়ার না থাকলে ডিজিটাল কাজ চলবে কেমন করে? এখন দেখছি, একের পর এক দেউটি (বিদ্যুৎ) কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দেশের প্রধান সংকটই লোডশেডিংয়ে এসে স্থির হচ্ছে তখন ভাবনাটিকে তো আর ডিজিটালাইজ করতে পারছি না। সেই অভিভূত হওয়ার রেশ কেটে যাচ্ছে এখন।
গত বুধবার বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশ করে বলেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মূলত একনায়কতন্ত্রের নিরাপত্তা আইন। এই আইন জনগণের নিরাপত্তা দেয় না। বরং উল্টোটাই করে। একটা খবরের শিরোনাম এই রকম: বরিশালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত কাউন্সিলরের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা।’ এসব খবর পড়ার আগেই তো জেনেছি যে এই আইনে সাংবাদিকদেরও আটক করে মামলায় ফাঁসাচ্ছে পুলিশ। পুলিশ মানে কি সরকার? বা সরকার মানে কি আইনরক্ষার কাজে নিয়োজিত নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা? পুলিশের কাজ-কারবার দেখে মনে হচ্ছে দেশটা পুলিশি হয়ে যাচ্ছে। সেখানে সব কিছু ডিজিটাল হবে কেমন করে? সেপাই স্তরের কর্মীরা তো কম্পিউটারাইজ বিষয়টিতে দক্ষ নয়, অভিজ্ঞতাও তেমন জমেনি। তাহলে?
প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামান এবং সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ওই আইনে মামলা হয়েছে। এগুলো আলোচিত মামলা। আন্তর্জাতিক সমাজে সমালোচিত মামলা। অনালোচিত, প্রায় নিঃশব্দে চলছে এরকম মামলার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু সরকার তা স্বীকার করেন না। তারা ধোয়া তুলসীপাতা, যেন তারা পূজার বেদীতে দেয়া ফুল। গন্ধ নেই বটে, কিন্তু দৃষ্টির শুভ্রতা আছে। কেমন শুভ্রতা ছড়িয়ে আছে। সেই সরকার বলেন, ডিজিটাল আইনে কোনো সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়নি। যদিও সরকারের আইনমন্ত্রী বলেছেন, ওই আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। একি! কথা তিনি বললেন?
তিনি বলেছেন, আমরা বিরোধী রাজনীতিকদের দাবি অনুযায়ী আইনটি বাতিল করবো না, তবে সংস্কার করে নেবো। যে সব জায়গায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় আছে, সে সব বাদ দেওয়া হবে। তার এই কথা বাকোয়াজের মতো শোনায়। তবে শব্দে সাধারণের মনে কোনো বিশ্বাস জন্ম নেয় না। তারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য যতটুকু বজ্রআঁটুনি প্রয়োজন, তা আরও কষে নিয়ে সংশোধনের প্যাঁচগুলো টানবেন। এই শিক্ষাই তো ব্রিটিশরা দিয়ে গেছে। কেননা, তারা ছিল আমাদের ঔপনিবেশিক প্রভু, আর আমরা হলাম বা ছিলাম ঔপনিবেশের ভৃত্য বা শাসিত।
শাসক আর শাসিতের মধ্যে যে দূরত্ব আর প্রশাসনিক ব্যবহার আজকের, এই স্বাধীন দেশের প্রশাসক ও আইনরক্ষাকারীদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সেই কথাই বলে আমাদের। সেটা বুঝতে হলে একটু খেয়াল করতে হবে বিষয়টা। জনগণের প্রতিনিধি আইনমন্ত্রী, কিন্তু তার কথা বলার ধার ও ধরন জনগণের প্রতিনায়কের মতো, অনেকটাই ধমকের মতো শোনায়। তিনি মেনে নিয়েছেন যে ভুল-ত্রুটি আছে, সেটা তিনি সংশোধনও করবেন, এটাই তো যথেষ্ট! নয় কি? কিন্তু সেই সংশোধনে সরকারের স্বার্থই যে তিনি রক্ষা করবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ তিনিও সরকারেরই অংশ। কেননা, দেশের কথিত মালিক জনগণকে তো তিনি ও তারা জবাবদিহি করেন না, করার কথা ভাবেনও না। এই যে না ভাবার সংস্কৃতি সেটা তো ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লিগেসি, অসংগঠিত জনগণের কাছে কি জবাবদিহি করবেন তারা?
আইনমন্ত্রীর এই কথিত ডিজিটাল আইনের প্রতি এতো দরদের পেছনে কী কারণ আছে, তা আমরা বলতে পারবো না। তবে, স্বার্থ ছাড়া তো আর আইন সৃষ্টি হয় না। এই সত্য ধরেই তো আমরা বাংলাদেশে প্রচলিত সব ব্রিটিশ-পাকিস্তানি আইনকে সিদ্ধ করে রেখেছি। আর যে সব আইন গত ৫০ বছরে সৃষ্টি হয়েছে, তার সিংহভাগের উদ্দেশ জনগণের স্বার্থরক্ষার নয়, নিজেদের ক্ষমতা অটুট/ পাকাপোক্ত রাখার স্বার্থে সৃজন করা হয়েছে। তারই বড় নমুনা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এবং সম্প্রতি নির্বাচনী আইন সৃষ্টি করে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা হ্রাস করা। আরপিওতে এমনিতেই ফাঁসগুলোর রূপায়ণ আমরা লক্ষ্য করেছি, সেটাকে আরও কষে নিলেন সরকার, যাতে তাদের বিজয়ের বাধাকে ঠেকানো যায়।
আপনি যদি ফেসবুকে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে কোনোটায় সরকারের সমালোচনা করেন তাহলেই আপনাকে ডিজিটাল আইনে অপরাধী হিসেবে আটক করতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই রকম বয়ানই দেওয়া আছে। অথচ সংবিধানে, আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইনে জনগণের কথা বলার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল আইন কেবল সাংবাদিকতাকেই নয়, গোটা সমাজ ও দেশকে কথা বলার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এটা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কিন্তু তারপরও সরকার তাতে কোনো অন্যায় দেখেন না। এই আইনটি সচেতন জনগণ, রাজনৈতিক দলগুলো বাতিল করে নতুন করে আইন সৃষ্টি করা বলছেন বা দাবি তুলেছেন, সরকার সেই দাবি কানে তুলছেন না। আর আইনমন্ত্রী এই আইন সংশোধন করা হবে বলেই তাঁর কর্তব্য শেষ করেছেন। তিনি এবং তাদের সরকার যে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, এই গণতান্ত্রিক খেয়ালটুকুও তাদের নেই।
আইনটি ডিজিটালি করায় আমরা আমজনতা তো কিছু বুঝতেই পারি না। কোন কথাটা অপরাধের আর কোন কথাটা আইনসম্মত। আমরা বলি কি, আমজনতার জন্য হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সোজা করে লেখেন। সরকারের সমালোচনা করার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রত্যেকের আছে। এই অধিকার ভোগ করতে না দিলে, সরকারই যে সংবিধানের রক্ষাকারী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, তাকে কেটে ফেলা হবে, অবজ্ঞা করা হবে।
সেটা হবে অবৈধ ও বেআইনি। জনগণ আইন না মানলে তাদের অপরাধী বিবেচনা করা হয়, মামলা ঠুকে দিয়ে তার বিচার করা হয়, কিন্তু স্বয়ং পুলিশ বা সরকারি লোকেরা যদি আইন অমান্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
কিছু কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয় বটে, কিন্তু রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রী-মিনিস্টাররা যখন এমন সব কথা বলেন, যা সংবিধানের বিষয়কে লঙ্ঘন করে, সে-সব ব্যাপারে সরকার তরফ নিশ্চুপ থাকেন। এগুলো ন্যায়বিচার ও আইনের প্রয়োগ সবক্ষেত্রে সমান হয় না। এসব অসমতাই সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, ক্ষোভ জমে সমাজের বিস্তৃর্ণ এলাকায়, যা সমাজ সংসারকে অস্থির করে তোলে।
এখন বিরোধী রাজনীতিকরা দাবি করছেন জাতীয় নির্বাচন করতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কারণ বিগত দুটি জাতীয় সংসদের নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে এবং তাতে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে, যা দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষ দেখেছে ও জেনেছে। আন্তর্জাতিক সমাজের লোকেরাও তা দেখেছে। জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হলে চাই এমন নির্বাচন কমিশন, যারা ক্ষমতাসীনদের অংশীজন হবেন না।
সরকার দাবি করেন তারা গণতান্ত্রিক সরকার এবং জনগণ তাদের সঙ্গে আছে। জনগণ যদি সরকারি দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠিয়ে থাকে তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় এতো ভয় কেন? তারা তো উন্নয়নের জোয়ারেই আবারো ক্ষমতায় যাবেন। ভয় এখানেই যে বিগত নির্বাচন দুটিতে তারা রিগিং করে ক্ষমতা দখল করে নিজেদের নির্বাচিত দাবি করছেন।
সরকারি দলকে এ ধরনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। কোনো বিষয়ে সরকারের রিজিট থাকার মানে হচ্ছে সেখানে রয়েছে তার রাজনৈতিক স্বার্থের দুর্বলতা। এই দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে যদিও, তবে তা প্রকট হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট।
এইচআর/ফারুক/এমএস